• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 1 July, 2026

মোদি-তাকাইচি শীর্ষ বৈঠক কি গড়বে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা বলয়

নরেন্দ্র মোদী যখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে বসবেন

মোদি-তাকাইচি শীর্ষ বৈঠক কি গড়বে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা বলয়

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে বসবেন, তখন বিশ্ব নজর রাখবে এশিয়ার ‘দুই বড় শক্তি’ আদৌ কি এমন এক নতুন অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যা অনিশ্চিত
ভূ-রাজনীতির এই সময়ে বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলার ওপর আঘাত সামলাতে সক্ষম। উল্লেখ্য, বুধবার দিল্লিতে পৌঁছেছেন তাকাইচি৷
আগের ভারত-জাপান বৈঠকগুলিতে যেখানে পরিকাঠামো প্রকল্প, বুলেট ট্রেন বা সাধারণ কৌশলগত ঘোষণা প্রধান বিষয় ছিল, এবারকার বৈঠক একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। একের পর এক বিশ্বব্যাপী সঙ্কট অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সীমারেখাকে প্রায় মুছে দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অনিয়মিত শুল্কনীতি, উপসাগরীয় অঞ্চলে বারবার সংঘাত, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের বাড়তি ঝুঁকি এবং চিনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক শক্তি— এই সবকিছুই দিল্লি ও টোকিওকে বিশ্বায়ন সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের ধারণা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
ফলে এই শীর্ষ বৈঠকের মূল লক্ষ্য হতে পারে বাইরের ধাক্কা থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো।
প্রাক্তন বিদেশ মন্ত্রকের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী
ইউএনআইকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি তাঁর প্রাক্তন পথপ্রদর্শক শিনজো আবে-র মতোই বুঝেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা ভাঙার প্রয়োজন আছে। দুই দেশের নিরাপত্তা স্বার্থ— অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা— দুটিতেই গভীর মিল রয়েছে… এবং আমি মনে করি সেটাই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।’
বৈঠকের আলোচ্যসূচিও এই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, পরিষ্কার জ্বালানি, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, ডিজিটাল পরিকাঠামো— এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা এবং সম্ভাব্য ইয়েন-রুপি বাণিজ্য চুক্তি। চক্রবর্তী স্বীকার করেছেন, ‘ইয়েন-রুপি চুক্তির কথা চলছে, দেখা যাক সেটা কতদূর এগোয়।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতার চুক্তি এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সুরক্ষার ঘোষণা কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ হবে না— এর গুরুত্ব আরও গভীর। ‘এটি স্বীকার করে নেওয়া হবে যে, ভবিষ্যতের
ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমশ সরবরাহ শৃঙ্খল, কম্পিউটিং ক্ষমতা এবং কৌশলগত সম্পদের প্রাপ্যতা নিয়ে হবে— শুধু প্রচলিত সামরিক শক্তির মাধ্যমে নয়’, বলেন ওই প্রবীণ কূটনীতিক।
উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরেও ভারত এখনও আমদানিনির্ভর প্রযুক্তি ও দুর্বল সরবরাহ শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল। জাপানের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা এমন এক সুযোগ এনে দিতে পারে, যা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে দেশীয় উৎপাদনকে দ্রুত এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সহযোগিতা ভারতের সেই বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে মানানসই, যেখানে ভারত নিজেকে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে— বিশেষ করে যখন বহুজাতিক সংস্থাগুলি চিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চাইছে।
জ্বালানি নিরাপত্তাও দুই দেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে বিদেশ মন্ত্রকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালীর সাম্প্রতিক সঙ্কট দেখিয়ে দিয়েছে, পশ্চিম এশিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে ভারত ও জাপান কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
ইরানের সঙ্গে সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমলেও, নীতিনির্ধারকদের অনেকেই মনে করেন ঝুঁকি এখনও কাটেনি। আবার যদি সমুদ্রপথে বাধা সৃষ্টি হয়, তবে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে এবং অর্থনীতি চাপে পড়তে পারে।
দুই দেশই আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, জ্বালানি পরিকল্পনায় সমন্বয় এখন আর শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়— এটি কৌশলগত প্রয়োজন।
তাই আলোচনায় জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি, এলএনজি সহযোগিতা এবং বাজার সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদানের বিষয়ও থাকতে পারে। এগুলি আপাতদৃষ্টিতে প্রযুক্তিগত মনে হলেও, আসলে এগুলি এমন এক ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা, যা
ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করবে।
এই শীর্ষ বৈঠক ভারত-জাপান সম্পর্কের আরেকটি নতুন ধাপের সূচনাও করতে পারে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে।
ভারতের সঙ্গে জাপানের ইতিমধ্যেই কিছু প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। পূর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ড. রাজারাম পান্ডা বলেন, ‘প্রতিরক্ষা উৎপাদনে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।’
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাকাইচি ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাই মোদীর সঙ্গে বৈঠকে কোয়াড বা কোয়াড-সদৃশ কাঠামো নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে।
তাঁদের মতে, প্রয়াত শিনজো আবে-র সময়েই ভারত-জাপান সম্পর্ক কৌশলগত গুরুত্ব পায়। তিনি ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা তুলে ধরেন, কোয়াডকে শক্তিশালী করেন এবং চিনের বাড়তি প্রভাব মোকাবিলায় ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেন। আবে-র কৌশল ছিল সরাসরি সংঘাত না বাড়িয়ে জোট শক্তিশালী করা।
বিশ্লেষকদের মতে, তাকাইচি সেই কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন, কিন্তু সেটিকে আরও অর্থনৈতিক শক্তি দিতে চান।
যদিও শুরুতে তাঁকে চিনের প্রতি কঠোর অবস্থানের নেতা হিসেবে দেখা হয়েছিল, তাঁর সরকার এখন পর্যন্ত বড় ধরনের উত্তেজনা এড়িয়ে চলেছে।
বরং টোকিও এমন এক নীতি অনুসরণ করছে, যেখানে কৌশলগত নির্ভরতা কমানো হচ্ছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা হচ্ছে না— যা অনেকটাই ভারতের নীতির সঙ্গে মিলে যায়।
দুই দেশই চিনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছেদ চায় না। কারণ তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
‘বরং তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খলা গড়ে তুলছে, পাশাপাশি যেখানে সম্ভব বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখছে’, জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এই সপ্তাহের আলোচনায় প্রতিরক্ষা উৎপাদন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কৌশলগত প্রযুক্তি এবং দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
‘সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা— এই বিষয়গুলি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে’, বলছেন কর্মকর্তারা।
মোদী-তাকাইচি বৈঠক কোয়াডের বিকাশকে আরও জোরদার করতে পারে। এই জোটে রয়েছে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি এটিও স্পষ্ট হবে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না— অর্থনৈতিক কৌশলই হবে তার মূল হাতিয়ার।