সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান এস মহেন্দ্র দেব এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, আগামী কয়েক দশক ধরে যদি ভারতের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে বছরে ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি না পায়, তবে দেশটি ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ (middle-income trap) আটকে পড়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে। এই ফাঁদে পড়া মানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছনো, যেখানে প্রাথমিক উন্নয়নের গতি থেমে যায় এবং একটি দেশ আর উচ্চ আয়ের রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে পারে না।
মধ্যম আয়ের ফাঁদ কোনও তাত্ত্বিক ধারণা নয়; লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু দেশ এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। সাধারণত এই ফাঁদের সূচনা হয় তখনই, যখন অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্বটি সম্পন্ন হয়। এই পর্বে সস্তা শ্রম ও নিম্ন-মূল্যের পরিষেবা খাত অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আয় বাড়ে, মজুরি বাড়ে, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বল্পমূল্যের উৎপাদনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। এই অবস্থায় পরবর্তী ধাপে পৌঁছতে হলে দরকার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, উদ্ভাবন, উচ্চমানের গবেষণা এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্পের বিকাশ।
Advertisement
ভারতের ক্ষেত্রে এখানেই উঠছে প্রশ্ন। মহেন্দ্র দেবের সতর্কবার্তা নিছক তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমান প্রবণতার দিকেই তা ইঙ্গিত করে। প্রথমত, ভারতের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের হার দীর্ঘদিন ধরেই নিম্ন ত্রিশ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। উৎপাদনশীল খাতে বড়সড় নতুন বিনিয়োগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ বৃদ্ধির হার বজায় রাখা কার্যত অসম্ভব।
Advertisement
দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ভারতের ঘাটতি ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। উচ্চমানের মৌলিক গবেষণায় ভারত আন্তর্জাতিক স্তরে অনেকটাই পিছিয়ে। বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় কোনও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতার অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক পদ শূন্য পড়ে থাকা, পাঠ্যক্রমের মান নিয়ে প্রশ্ন এবং গবেষণার পরিবেশের অবনতি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
এর সরাসরি ফল হল ‘ব্রেন ড্রেন’।
প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রী ও গবেষকরা নিয়মিতভাবে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন, যেখানে গবেষণার সুযোগ, অর্থায়ন এবং অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে, দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলিও ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। তারা নতুন প্রযুক্তি বা জ্ঞান তৈরি করার পরিবর্তে পরীক্ষিত প্রযুক্তি ‘অফ দ্য শেল্ফ’ কিনে নেওয়াকেই নিরাপদ পথ বলে মনে করছে। ফলে দেশে জ্ঞান উৎপাদনকারী শিল্পের অবকাঠামো দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।
পরিষেবা খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও একটি বড় সমস্যা। তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস কিংবা অন্যান্য পরিষেবাভিত্তিক শিল্প ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ঠিকই, কিন্তু এই ক্ষেত্রগুলিতেও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে ভারতের আয়ের বড় অংশ আসে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন থেকে। কিন্তু বায়োটেকনোলজি, জিন থেরাপি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ওষুধ আবিষ্কারের মতো আধুনিক ও উচ্চ-মুনাফার ক্ষেত্রগুলিতে ভারতের উপস্থিতি এখনও সীমিত।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়াতে হলে কেবল উচ্চ বৃদ্ধির হারই যথেষ্ট নয়, বৃদ্ধির গুণগত মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করা, শিল্প ও গবেষণার মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র গড়ে তোলা এবং উদ্ভাবনকে ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য নীতিগত সহায়তা— এই সবকিছু মিলিয়েই একটি টেকসই পথ তৈরি হতে পারে।
মধ্যম আয়ের ফাঁদ একবারে হঠাৎ আসে না; ধীরে ধীরে, নীরবে তার জাল বিস্তার করে। আজ যে সতর্কবার্তা উঠে আসছে, তা উপেক্ষা করলে আগামী দিনে তার মূল্য চোকাতে হতে পারে অনেক বেশি। ভারতের সামনে এখনও সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আত্মতুষ্টি নয়, চাই কঠোর আত্মসমালোচনা ও সাহসী নীতি সিদ্ধান্ত।
Advertisement



