• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 10 October, 2026

অণুদের ডান ও বাম রহস্যেই রসায়নে নোবেল

একবার নিজের দুটো হাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ডান হাত আর বাঁ হাত— দুটিই দেখতে প্রায় একই রকমের, পাঁচটি আঙুল, তালু, কবজি—

অণুদের ডান ও বাম রহস্যেই   রসায়নে নোবেল

একবার নিজের দুটো হাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ডান হাত আর বাঁ হাত— দুটিই দেখতে প্রায় একই রকমের, পাঁচটি আঙুল, তালু, কবজি— সবই আছে।  কিন্তু বাঁ হাতটিকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, তাকে ডান হাতের সঙ্গে এমনভাবে মেলানো কখনই সম্ভব নয় যাতে দুটি হাতই একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়।  বরং একটা আয়নার সামনে ডান হাত তুললে যে প্রতিবিম্বটি দেখা যায়, সেটিই মনে হয় যেন বাঁ হাত। এই অদ্ভুত মিল আর অমিল নিয়ে দৈনন্দিন জীবনে খুব একটা ভাবনা চিন্তা করা হয় না।  অথচ প্রকৃতি এই খেলাটি খেলেছে অণুর জগতে।
ধরা যাক, একটি অণু দেখতে অনেকটা এমন একটি ছোট্ট ‘হাতের দস্তানার’ মত যার পরমাণুগুলি এমনভাবে সাজানো যে একটি দেখতে ডান হাতের মত, অন্যটি বাঁ হাতের মত।  দুটির রাসায়নিক সূত্র একই, পরমাণুর সংখ্যাও একই; কিন্তু একটি আরেকটির নিখুঁত দর্পণ-প্রতিবিম্ব।  তাদের একটির জায়গায় অন্যটিকে বসালেই সব সময় একই কাজ হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।  এখন আরও আশ্চর্যের ঘটনাটি হল, আপনি যদি এমন একটি ওষুধ তৈরি করতে চান, যেখানে শুধু ‘ডান হাতের’ অণুটিই দরকার, কিন্তু আপনার রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সমান সংখ্যায় ডান ও বাঁ—দুই ধরনের অণুই বানিয়ে ফেলে, তাহলে কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আধুনিক রসায়নকে বহু দূর এগোতে হয়েছে।
২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারের গল্প মূলত সেই অনুসন্ধানের গল্প। ফ্রান্সের সুদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক  রসায়নবিজ্ঞানী হেনরি বি.কাগান এবং জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রসায়নবিজ্ঞানী কেনসো সোয়াইয়ের কাজ দেখিয়েছে, কীভাবে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত ‘হাতের’ অণুকে বেছে নেওয়া যায় এবং কীভাবে সেই সামান্য পক্ষপাত পরবর্তী বিক্রিয়ায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
তাঁদের কাজটি হল অসমমিত স্বঅনুঘটন যা দেখায় যে, এই স্ববর্ধন  প্রক্রিয়াই আণবিক ডান-বাম হাতের বৈশিষ্ট্য বা সমাবয়বতাকে নির্দেশ করছে।  বিষয়টি শুনতে খুব শক্ত বলে মনে হলেও আসলে গল্পটি খুব সাধারণ। কিন্তু গল্পটি বোঝার জন্য প্রথমে একটা খুব সহজ দৃশ্য কল্পনা
করা যাক।
ধরা যাক, এক জোড়া জুতোর গল্প।  কারখানায় জুতো তৈরি হচ্ছে। এখন প্রয়োজন শুধু ডান পায়ের জুতো। কিন্তু কারখানার যন্ত্রটি এমন যে, প্রতি ১০০টি জুতোর মধ্যে ৫০টি ডান পায়ের এবং ৫০টি বাঁ পায়ের জুতোই সে তৈরি করবে। জুতো দুটির চামড়া একই, রং একই, মাপও একই। কিন্তু প্রয়োজনের দিক থেকে তারা কিন্তু এক নয়। এখন যদি কারখানার যন্ত্রটিকে একটু বদলে এমন করা যায় যে ৯০টি ডান পায়ের জুতো এবং মাত্র ১০টি বাঁ পায়ের জুতোই তৈরি করবে, তাহলে  কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। রসায়ন বিজ্ঞানে অ্যাসিমেট্রিক সিনথেসিস অর্থাৎ অপ্রতিসম সংশ্লেষণ  অনেকটা সেই কাজই করে। এখানে অবশ্য জুতোর বদলে তৈরি হচ্ছে অণু।  আর
ডান-বাঁয়ের পার্থক্যটি তৈরি হচ্ছে অণুর ত্রিমাত্রিক বিন্যাসে।
আমাদের শরীরের প্রোটিন, উৎসেচক, ডিএনএ ও অন্যান্য জৈব অণুর নিজস্ব ত্রিমাত্রিক একটা গঠন রয়েছে। ফলে একটি অণু শরীরের কোনো প্রোটিনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে তার আকৃতির ওপর। একটি তালায় যেমন নির্দিষ্ট আকৃতির চাবি লাগে, শরীরের আনবিক যন্ত্রপাতিগুলিকে খুলতে এবং বন্ধ করতে  তেমন নির্দিষ্ট আকৃতির অণুদের কাজে লাগানো হয়। এখানেই আসে বিজ্ঞানী কাগানের গবেষণা। রসায়নবিজ্ঞানীদের সমস্যা হল— তাঁরা জানেন কোন অণুটি তাঁর দরকার, কিন্তু সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত অণুর পাশাপাশি তার দর্পণ প্রতিবিম্বও তৈরি হচ্ছে। তাই দরকার এমন একটা ব্যবস্থা, যা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে একটি নির্দিষ্ট দিকে একটু বেশি বদলে দেবে যাতে পার্থক্যটা সহজে বোঝা যায়।
রসায়ন বিজ্ঞানী  হেনরি বি কাগানের কাজ এই ক্ষেত্রে একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি অসম জৈবিক সংশ্লেষণের  বিকাশ করে দেখিয়েছেন, উপযুক্ত চিরাল পরিবেশ, অনুঘটক এবং বিক্রিয়ার নকশা ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট এন্যান্টিওমার তৈরির সম্ভাবনা বাড়ানো যায়। অর্থাৎ রাসায়নিক বিক্রিয়াকে শুধু ঘটতে দেওয়া নয়— তার মধ্যে পছন্দ তৈরি করা।  প্রকৃতির সামনে দুটি দরজা খোলা থাকলে, রাসায়নিক কৌশলের সাহায্যে একটি দরজাকে অন্যটির চেয়ে সহজে পার্থক্য করে দেওয়া।
বর্তমানে ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে বিষয়টি কেন  এত গুরুত্বপূর্ণ? ধরা যাক, কোনও ওষুধের কাঙ্ক্ষিত অণু হল ‘ডান হাতের’ রূপ।  কিন্তু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তার সঙ্গে সমান পরিমাণে ‘বাঁ হাতের’ রূপও তৈরি হচ্ছে।  তাহলে কাঙ্ক্ষিত অণুটি আলাদা করতে কোনও একটি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে। আর যদি শুরু থেকেই এমন পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় যাতে কাঙ্ক্ষিত এন্যান্টিওমারই বেশি তৈরি হয়, তাহলে উৎপাদন আরও নিখুঁত  হতে পারে।  কারণ শরীরের প্রোটিন ও উৎসেচক  দুটিই ত্রিমাত্রিক।  ফলে একই রাসায়নিক সূত্রের দুই  দর্পণ প্রতিবিম্ব অণুর শরীরে একইভাবে আচরণ করবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।  এই কারণেই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের রসায়নে সমাবয়বতা অর্থাৎ কোহেরেন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা পালন করে।
তাই আজকের ওষুধ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানতে চান শুধু কোন কাঙ্ক্ষিত অণুটি তৈরি হয়েছে কি না-তা নয়, তার কোনও ত্রিমাত্রিক গঠন তৈরি হয়েছে কিনা?
এভাবেই  ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারের গল্প আরও গভীর আর তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে।  জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বহু অণু একটি নির্দিষ্ট ডান অথবা বাঁ দিকে অনুসরণ করে।  জীবনের রসায়নে এখনও এমন ধরনের ঘটনা ঘটে যা আজও আমাদের অজানা।  এখনও এর সম্পূর্ণ উত্তর
জানা নেই। এক্ষেত্রে একটি বিষয় বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করে— যদি শুরুতে  আণবিক জনসমষ্টির মধ্যে খুব সামান্য কোনও একটার দিকে যদি  পক্ষপাত থাকে, তাহলে স্ব-অনুঘটকীয় প্রক্রিয়া সেই পক্ষপাতকে ধীরে ধীরে বড় করে তুলতে পারে। এটি কিন্তু জীবনের উৎপত্তির চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। জীবনের আনবিক অসমতা কীভাবে গড়ে উঠতে পারে, সেই বৃহৎ প্রশ্নের সামনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক জানালা খুলে দেয়।
২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার সেই অদৃশ্য জগতের একটি গভীর সত্যকে সামনে নিয়ে আসে।  প্রকৃতির বড় গল্প কখনও কখনও শুরু হয় খুব ছোট একটি অসমতা দিয়ে। শরতের সন্ধ্যা নামে।  কাশফুলের ওপর থেকে আলো সরে যায়।  পৃথিবী অন্ধকারের দিকে এগোয়।  অথচ আমাদের চোখের আড়ালে অণুর জগতে কোনও বিরাম নেই। অসংখ্য অণু তাদের নিজস্ব নিয়মে চলছে, মিলে যাচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে, আবার তৈরিও হচ্ছে— তাদের কারও ডান হাত, কারও বাঁ  হাত। আর সেই ক্ষুদ্র ডান-বাঁয়ের ব্যবধানের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে জীবনের এক সুদূর রহস্য। রসায়ন সেই রহস্যের ভাষা পড়তে শেখে। ২০২৬ সালের নোবেল আমাদের মনে করিয়ে দেয়— বিশ্বকে বুঝতে কখনও কখনও আকাশের দিকে তাকাতে হয়, আবার কখনও তাকাতে হয় একটি অণুর দিকে। কারণ অসীমের মতোই ক্ষুদ্রের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে এক সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব।