• facebook
  • twitter
Sunday, 25 January, 2026

গ্রিনল্যান্ড ও ট্রাম্প

ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে একভাবে না হয় আরেকভাবে দখলের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প আসলে শুধু ডেনমার্ক নয়, গোটা ইউরোপকেই চাপে ফেলছেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে এক জনসমাবেশে ভাষণ দিচ্ছেন।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান এখন আর নিছক কূটনৈতিক কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ নেই। যা একসময় অদ্ভুত ও অবাস্তব শোনাত, তা আজ বাস্তব রাজনৈতিক চাপের রূপ নিয়েছে। ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে একভাবে না হয় আরেকভাবে দখলের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প আসলে শুধু ডেনমার্ক নয়, গোটা ইউরোপকেই চাপে ফেলছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ডেনমার্কের ত্যাগের কথা স্মরণ করা জরুরি। ন্যাটোর আফগানিস্তান যুদ্ধে ডেনমার্ক ৪৩ জন সেনাকে হারিয়েছিল— জনসংখ্যার তুলনায় যা ছিল সব ন্যাটো সদস্য দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু সেই আত্মত্যাগ ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে কার্যত মূল্যহীন। সাম্প্রতিক এক বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের নেতাদের সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের আলোচনা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তার পরেই হঠাৎ ঘোষণা করা হয়েছে— গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান না মানলে ইউরোপের আটটি দেশের ওপর নতুন শুল্ক চাপানো হবে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, আজ কি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব কেবল দরকষাকষির হাতিয়ার? ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাষাভঙ্গিতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব যেন ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। এই মানসিকতা শুধু ইউরোপের জন্য নয়, গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্যই গভীরভাবে উদ্বেগজনক।

Advertisement

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই জার্মানি, ফ্রান্স, নরওয়ে ও সুইডেন থেকে সেনা পাঠানো হয়েছে গ্রিনল্যান্ডে। নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক একটি যৌথ ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের কথাও বলছে। কিন্তু ন্যাটোর মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। ন্যাটোর সংবিধানের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এক সদস্যের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ। যদি যুক্তরাষ্ট্রই চাপ বা হুমকির পথ বেছে নেয়, তবে কি ডেনমার্ক ন্যাটোর সেই ধারা প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে?

Advertisement

এই প্রশ্নে ট্রাম্পের জবাব আরও অস্বস্তিকর। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড না ন্যাটো— এটা একটা পছন্দের বিষয় হতে পারে।’ রাশিয়া ইস্যুতে ন্যাটোকে আগেই বিভক্ত করেছেন ট্রাম্প। এবার শুল্ক আর অস্পষ্ট হুমকি ব্যবহার করে তিনি ডেনমার্ককে ছাড় দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন। ওয়াশিংটন ঠিক কী চায়— বাড়তি প্রভাব, না সরাসরি নিয়ন্ত্রণ— তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু দিকনির্দেশ একটাই, যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে।

শক্তির রাজনীতি দিয়ে হয়তো সাময়িক লাভ হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা প্রতিরোধই বাড়ায়। মিত্রদের প্রতি অবজ্ঞা দেখানো একটি পরাশক্তি শেষ পর্যন্ত নিজেকেই কঠিন দেয়ালে ঠেলে দেয়— এই ইতিহাস নতুন নয়।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। যে কোনও দিন চুক্তি সই হতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সক্রিয়ভাবে দিল্লিতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। কিন্তু যদি আটলান্টিকের দুই পাড়ে উত্তেজনা বাড়ে, তার ছায়া এইসব আলোচনার উপরও পড়বে।

ভারতের উচিত এই সময়ে ঠান্ডা মাথায় নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সমঝোতা নিশ্চিত করাই হবে বাস্তবসম্মত পথ। ‘নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’ বা ‘এটা যুদ্ধের যুগ নয়’— এই ধরনের নীতিকথা ট্রাম্পকে প্রভাবিত নাও করতে পারে। কিন্তু ধারাবাহিকতা, দৃঢ়তা এবং নিজের অবস্থানে অনড় থাকা ভারতের কূটনৈতিক শক্তি বাড়াবে।
বিশ্ব রাজনীতি যখন প্রতিদিন বদলাচ্ছে, তখন ভারতের কৌশলগত দিকনির্দেশও হতে হবে সূক্ষ্ম ও বাস্তববাদী। ইউরোপ ঠিক করবে কীভাবে তারা ট্রাম্পের এই দাদাগিরির মোকাবিলা করবে। আর ভারত নিজের পথ নিজেই বেছে নিয়ে, নীরবে কিন্তু স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবে যে শুল্ক আর সার্বভৌমত্ব এক জিনিস নয়।

Advertisement