• facebook
  • twitter
Monday, 19 January, 2026

ইরানে নাক গলাচ্ছে আমেরিকা

ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুকে ইরানিদের ‘প্রধান খুনি’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের বার্তা ভালভাবে নেয়নি খামেনেই প্রশাসন

শোভনলাল চক্রবর্তী: সরকার-বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ইরান। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েক বার ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে পড়েছে আয়াতোল্লা খামেনেই-এর সরকার। কিন্তু এবারে রাজধানী তেহরানের সীমা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভের আঁচ। রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। এ দিন ইসফাহান শহরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং’ (আইআরআইবি) ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর বান্দার আব্বাসের রাস্তায় নামেন হাজার হাজার মানুষ। বিদ্রোহ দমনে খামতি রাখছে না সরকারও।

এখনও পর্যন্ত যা তথ্য মিলেছে, তাতে অন্তত ৪২ জনের ফাঁসি হয়েছে, আর ১৬০০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ​​​শিশুও রয়েছে। ২২৭০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলি জানিয়েছে, এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে এবং সরকার সেই তথ্য কিছুতেই বাইরে আসতে দেবে না। আন্দোলনের আঁচ বাড়তেই রাতারাতি দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট করে দিয়েছে প্রশাসন। দেশের বাইরে টেলিফোন-যোগাযোগও বন্ধ। যে গতিতে সরকার এই কাজ করেছে, তাতে স্পষ্ট দুশ্চিন্তায় সরকারও। রাস্তায় সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়ার পরেও সাধারণ মানুষ ভীত নন।

Advertisement

প্রতিবাদ জারি রয়েছে। ৮৬ বছর বয়সি ইরানের সর্বোচ্চ শাসক খামেনেই টেলিভিশন-বার্তায় বলেছেন যে সকলের জানা উচিত, কয়েকশো হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে ইসলামিক রিপাবলিক গঠিত হয়েছে। কিছু বিশ্বাসঘাতকের জন্য এই দেশ ভাঙবে না। তিনি আরও বলেন, কিছু মানুষ বিদেশি শক্তির ভাড়াটে গুন্ডার মতো কাজ করছেন। তাঁদের বরদাস্ত করা হবে না। নাম না করে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে আঙুল তুলেছেন তিনি।
এই আন্দোলনের শুরু গত বছর ২৮ ডিসেম্বর। ইরানি মুদ্রার দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া, মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিক্ষোভ দেখানো শুরু করেন সাধারণ মানুষ।

Advertisement

কিন্তু ধীরে ধীরে এতে রাজনীতির রঙ মিশেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শাসনক্ষমতার পরিবর্তন। তাঁরা ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থার শেষ চান। অঞ্চল-জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ দেশের অন্তত ১০০ শহরে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। স্লোগান উঠেছে বেকারত্ব ও জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে। কড়া হাতে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ রয়েছে বাহিনীর কাছে। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে জায়গায় জায়গায় কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া হচ্ছে। গুলি, গণহারে গ্রেপ্তারি কিছুই বাদ রাখছে না তারা।ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, তারা ইরানের পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছে। ইরানে বসবাসকারী ভারতীয়দের সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে। তবে এখনই চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি বলে মনে করছে দিল্লি।

উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি তিনি সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে কী সেই সাহায্য, তা নিয়ে পরিষ্কার কিছু জানাননি। ট্রাম্প তাঁর সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ইরানে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন। এও বলেন, তাঁদের সাহায্য করবেন। পাশাপাশি, ইরান সরকারের সঙ্গে সব আলোচনা বাতিল করা হয়েছে বলে জানান ট্রাম্প। তিনি আরও জানান, যতক্ষণ না বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ সব আলোচনা বন্ধ থাকবে।

ইরানের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কী ভাবে হস্তক্ষেপ করা যায়, কী কী কঠোর পদক্ষেপ করা যায়, মার্কিন বাহিনীর সামনে কী বিকল্প রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে আমেরিকায়। সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল না। তার মাঝেই সমাজমাধ্যমে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে যারা বাণিজ্য করবে তাদের উপরে শুল্ক চাপাবে আমেরিকা।অন্য দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে এক বন্ধনীতে ফেলে আক্রমণ শানিয়েছে ইরান। সে দেশে চলমান বিক্ষোভ নিয়ে ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের পর ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুকে ইরানিদের ‘প্রধান খুনি’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের বার্তা ভালভাবে নেয়নি খামেনেই প্রশাসন। ইরানের প্রাক্তন পার্লামেন্ট স্পিকার তথা দেশের নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা সর্বময় কর্তা লারিজানি এক্স পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা ইরানের জনগণের প্রধান হত্যাকারীর নাম ঘোষণা করছি। তালিকা করে তিনি জানান, প্রথমে আছে ট্রাম্পের নাম, তার পরে নেতানিয়াহু!’ এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ-ও জানান, ইরান সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়া শুরু করে, তবে আমেরিকা ‘খুব কঠোর পদক্ষেপ নেবে’!

খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার জন্য গত ৮ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় ইরফান সোলতানি নামে ২৬ বছর বয়সি এক যুবককে। তেহরান শহরতলির বাসিন্দা ওই যুবককে বন্দি করে রেখেছে ইরান প্রশাসন। গত ১১ জানুয়ারি ওই যুবকের পরিবারকে মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ইরানের এক মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, ইরফানকে যে কোনও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির অভিযোগ, সোলাতানিকে কোনও আইনজীবী দেওয়া হয়নি।

একপ্রকার বিনা বিচারেই তাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। বন্দি হওয়ার পর থেকে মাত্র একবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পেরেছেন ওই যুবক। তা-ও মাত্র ১০ মিনিটের জন্য। এই মুহূর্তে ইরান প্রশাসন এবং ট্রাম্প সরকার সম্মুখ সমরে, শেষ পর্যন্ত কি ঘটে তার উত্তর একমাত্র সময়েই দিতে পারবে। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর প্রশ্ন ট্রাম্প সাহেব হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। অতএব বোঝাই যাচ্ছে ট্রাম্প খুঁচিয়ে চলবেন, তাতে কার কি এলো গেলো, সে কথা তিনি গায়ে মাখতে নারাজ। এই না হলে বিশ্বের বড়দা!

Advertisement