• facebook
  • twitter
Sunday, 8 February, 2026

এপস্টিন ফাইল

ভারতের ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব— বিশেষ করে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী— প্রধানমন্ত্রীর নাম এই ফাইলে থাকার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

শিশুদের যৌন নিগ্রহকারী হিসেবে কুখ্যাত জেফ্রি এপস্টিন— এই নামটি আজ আর শুধু একটি অপরাধীর পরিচয় নয়। এপস্টিন এখন এক ভয়াবহ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব একসঙ্গে মিলেমিশে নৈতিকতার সীমা মুছে দেয়। সম্প্রতি এপস্টিন সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি বা তথাকথিত ‘এপস্টিন ফাইল’ প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক।

এই বিতর্কের ঢেউ ভারতেও এসে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে এই ফাইলগুলিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম রয়েছে। পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে দেশের অন্যতম বড় শিল্পপতি অনিল অম্বানির নামও। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম, যিনি একসময় এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বলে নানা পুরনো ছবি ও সামাজিক যোগাযোগের সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।

Advertisement

এই সব অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: কোনটা তথ্য, আর কোনটা অনুমান বা রাজনৈতিক হাতিয়ার?

Advertisement

প্রথমেই পরিষ্কার করে বলা দরকার, এপস্টিন ফাইলে কারও নাম থাকা মানেই তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেছে, এমন নয়। বহু ক্ষেত্রে এই নথিগুলি ইমেল, পরিচিতি তালিকা, সামাজিক যোগাযোগ বা সফরের উল্লেখমাত্র। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, এপস্টিনের অপরাধের চরিত্র এতটাই জঘন্য এবং তার যোগাযোগের জাল এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, প্রতিটি নামই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ভারতের ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব— বিশেষ করে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী— প্রধানমন্ত্রীর নাম এই ফাইলে থাকার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন। তাঁদের দাবি, এত গুরুতর একটি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রে যদি দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম ওঠে, তবে তা নিয়ে নীরব থাকা যায় না। অন্যদিকে সরকার এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কোনও বেআইনি সম্পর্ক বা এপস্টিনের কুখ্যাত দ্বীপে যাওয়ার প্রমাণ নেই।

একইভাবে শিল্পপতি অনিল অম্বানির নাম ঘিরেও প্রশ্ন উঠছে। বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলির সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নতুন নয়, কিন্তু এপস্টিনের মতো চরিত্রের সঙ্গে কোনও ধরনের যোগাযোগ থাকলে তার ব্যাখ্যা জনসমক্ষে আসা জরুরি। কারণ বড় পুঁজির সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এমনিতেই ভারতে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উঠে আসা আরও জটিল প্রশ্ন তোলে। এপস্টিনের সঙ্গে ট্রাম্পের বন্ধুত্বের কথা অতীতে সংবাদমাধ্যমে এসেছে, যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তিনি পরে এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতো ক্ষমতাশালী ব্যক্তির নাম এমন একটি নথিতে ওঠা মানেই বিষয়টি শুধুই ব্যক্তিগত সম্পর্কের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রাষ্ট্রনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নও তৈরি করে।
এই গোটা ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে তিনটি বড় সত্য তুলে ধরে। প্রথমত, যৌন নিগ্রহের মতো অপরাধে শিকারদের ন্যায়বিচার এখনও অসম্পূর্ণ। নামের তালিকা, রাজনৈতিক তরজা আর মিডিয়ার শোরগোলের আড়ালে এপস্টিনের অসংখ্য শিকার আজও প্রকৃত বিচার থেকে দূরে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষদের জবাবদিহির প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী হোন বা প্রেসিডেন্ট, শিল্পপতি হোন বা রাজনীতিক— গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা খোলা মনে, স্বচ্ছভাবে খতিয়ে দেখা গণতন্ত্রের মৌলিক দাবি। তৃতীয়ত, গুজব ও তথ্যের পার্থক্য বোঝার দায়িত্ব। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে

আধা-সত্য দ্রুত পূর্ণ অভিযোগে পরিণত হয়। এতে যেমন সত্য আড়ালে চলে যায়, তেমনই নিরপরাধ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

এপস্টিন ফাইল তাই শুধু একটি নথি নয়; এটি আমাদের সময়ের আয়না। এই আয়নায় দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার অন্ধকার দিক, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, কর্পোরেট প্রভাব এবং নৈতিকতার ভঙ্গুরতা। সত্য কোথায় শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবে, তা নির্ভর করবে স্বাধীন তদন্ত, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং নাগরিক সমাজের চাপের উপর।
নাম থাকলেই দোষী— এ কথা যেমন ঠিক নয়, তেমনই নাম উঠলেই চুপ করে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন করাই গণতন্ত্রের ধর্ম। আর সেই প্রশ্ন যত শান্ত, তথ্যনিষ্ঠ ও মানবিক হবে, ততই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছনো সম্ভব হবে।

Advertisement