বিহারের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। বহু দশক ধরে রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নীতীশ কুমার মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে, রাজ্যসভায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত কেবল একজন দীর্ঘকালীন মুখ্যমন্ত্রীর বিদায় নয়, এর সঙ্গে যেন বিহারের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির একটি ঐতিহ্যেরও অবসান ঘটছে। একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাজ্যের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাব।
নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক যাত্রার সূত্রপাত যে সময়ে, তা ছিল ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে যে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার অন্যতম প্রেরণাদাতা ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে যে ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’-এর স্বপ্ন সামনে এসেছিল, তা মূলত কংগ্রেস সরকারের একাধিপত্য ভাঙার উদ্দেশ্যে সংগঠিত হয়েছিল। সেই আন্দোলনেরই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে উঠে আসেন একদল তরুণ নেতা, যাদের মধ্যে নিতীশ কুমার এবং লালুপ্রসাদ যাদব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু যে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিকল্পের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। তবুও সেই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে যে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব উঠে আসে, তারা দীর্ঘদিন ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে।এই সময়েই কংগ্রেস-বিরোধী শক্তিগুলিকে একত্রিত করে গড়ে ওঠে জনতা পার্টি। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনের পর এই দল ক্ষমতায় এসে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা করে।
সেই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল জনসংঘের মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ। ভারতীয় জনসঙ্ঘ, যা মূলত আরএসএস-এর রাজনৈতিক শাখা হিসেবে পরিচিত ছিল, জনতা পার্টির অংশ হয়ে সরকারে যোগ দেওয়ার সুযোগ পায়। এই প্রক্রিয়াই পরবর্তী সময়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশের পথ প্রশস্ত করে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জনসংঘ থেকেই জন্ম নেয় বিজেপি। কিন্তু বিহারের রাজনৈতিক বাস্তবতা দীর্ঘদিন এই দলের পক্ষে সহজ ছিল না। কারণ রাজ্যে তখনও সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি শক্তিশালী ছিল, যা আরএসএস-প্রভাবিত হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের বিরোধী অবস্থানেই দাঁড়িয়ে ছিল।
ফলে বিহারের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান সহজে ঘটেনি।তবে নব্বইয়ের দশকে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্যেই এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। নীতীশ কুমার এবং তাঁর সহযোদ্ধা জর্জ ফার্নান্ডেজের নেতৃত্বে বিজেপির সঙ্গে সহযোগিতার পথ খুলে যায়। সেই রাজনৈতিক সমঝোতাই পরে জাতীয় স্তরে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত অটলবিহারী বাজপেয়ীকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসতে সাহায্য করে।
নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর এই পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক সমীকরণ। কখনও বিজেপির ঘনিষ্ঠ সহযোগী, কখনও আবার তীব্র সমালোচক— এই দুই অবস্থানের মধ্যেই তাঁর রাজনীতি চলেছে। এমনকি ২০২৩ সালে যখন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট গঠিত হয়, তখন অনেকেই তাঁকে সেই জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবেও দেখেছিলেন।
কিন্তু ভারতীয় রাজনীতির বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। বিরোধী শিবিরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং বিশেষ করে কংগ্রেসের শীতল মনোভাব নিয়ে নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নীতীশ কুমার শেষ পর্যন্ত আবার জোট পরিবর্তন করেন এবং ফিরে যান এনডিএ শিবিরে। সেই সিদ্ধান্তই অনেকের মতে নরেন্দ্র মোদীর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথকে আরও সুগম করে।
আজ যখন নীতীশ কুমার সক্রিয় রাজ্য রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন, তখন বিহারের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। বিজেপি এখন রাজ্যের রাজনীতিতে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির যে ধারাটি একসময় বিহারের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি ছিল, তা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।এই পরিবর্তনের মধ্যেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসছে, রাজনীতিতে উত্তরাধিকার। নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর পুত্রের নাম ঘোরাফেরা করছে। যদি সত্যিই সেই পথ বাস্তবায়িত হয়, তবে তা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির একসময়ের ঘোষিত আদর্শ— পরিবারবাদ-বিরোধী অবস্থানের সঙ্গেই এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি করবে।
সময়ের প্রবাহে রাজনীতির চরিত্র বদলায়, নতুন শক্তি উঠে আসে, পুরনো ধারাগুলি ম্লান হয়ে যায়। নীতীশ কুমারের বিদায় সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক। তবে ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, ভারতীয় রাজনীতি কখনও স্থির থাকে না। পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তার নতুন ভারসাম্য খুঁজে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিহারের রাজনীতিও সম্ভবত সেই পথেই এগোচ্ছে।
Advertisement