বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনা ক্রমশ উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এশিয়ায় চাল, পশ্চিম আফ্রিকায় কোকো থেকে শুরু করে ইউরোপে অলিভ অয়েল এবং উত্তর আমেরিকায় শাকসবজি—গত কয়েক বছরে এসব খাদ্যের দাম বেড়েছে ব্যাপকভাবে। এর জন্য যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের মতো বিষয়গুলো প্রায়শই সংবাদের শিরোনামে উঠে এলেও, অনালোচিত থেকেছে বৈশ্বিক খাদ্য-বাজারকে নতুন রূপ প্রদানকারী আরও একটি শক্তিশালী শক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন।
কিন্তু প্রশ্ন এখানেই, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কি জলবায়ু পরিবর্তনের আদপেই কোনও ভূমিকা থাকতে পারে?
খাদ্যের দাম বৃদ্ধিকে সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানির দাম, মুদ্রার বিনিময় হার, যুদ্ধ কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার মতো বিষয়গুলোর দিকে তাকিয়েই বিচার করতে শিখেছি আমরা আমাদের পুঁথিগত শিক্ষায়। কিন্তু যে বিষয়টি নীরবে খামার থেকে বাজার হয়ে নিত্যপণ্যের খরচের ওপর প্রভাব ফেলছে, তা যে আর কেউ নয়— জলবায়ু পরিবর্তন, এটাই আজও আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। বিশ্ব উষ্ণায়ন ফসলের ফলন কমাচ্ছে। খরা ফসল নষ্ট করছে এবং সেচের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বন্যা কৃষিজমি ধ্বংস করছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ঝড়ে বন্দরগুলোর ক্ষতি হচ্ছে এবং খাদ্য পরিবহনে বিলম্ব ঘটছে। আর যখন মানুষের খাদ্যের চাহিদা ক্রমবর্ধমান থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন কমে যাচ্ছে তখনই বেড়ে যাচ্ছে দাম।
মজার বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তন পুরো খাদ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস করলেই যে খাদ্যের দাম বাড়বে— এমন কিন্তু কোনও কথা নেই। আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থার কোনও একটি ধাপে বিঘ্ন ঘটলেই, তা পুরো বাজারের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
সুতরাং, জলবায়ু সংকট মানেই কেবল তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ, বনভূমি বা বরফ গলে যাওয়ার মত চিরাচরিত আলোচ্য বিষয়গুলোই নয়, এর সঙ্গে আমাদের খাবারের থালায় কী কী খাবার আসছে এবং তার জন্য আমাদের কত মূল্য দিতে হচ্ছে— সেই বিষয়গুলোও জড়িত হতে শুরু করেছে বর্তমানে।
কৃষিকাজ মূলত আবহাওয়ার স্থিতিশীলতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সফলভাবে ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষকদের প্রয়োজন যথাসময়ে পরিমিত বৃষ্টিপাত, উপযুক্ত তাপমাত্রা, উর্বর মাটি এবং ফসল ফলানোর জন্য অনুকূল ও নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তন এই প্রতিটি বিষয়কে ব্যাহত করছে। অতিরিক্ত তাপজনিত চাপ (heat stress) কৃষির জন্য অন্যতম প্রধান হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। গম, ভুট্টা, ধান এবং সয়াবিনের মতো ফসলগুলো নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পরিসরে সবচেয়ে ভালো ফলন দেয়। তাপমাত্রা যখন সেই সীমার বাইরে চলে যায়, তখন উদ্ভিদের বৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়ে, পরাগায়ন ব্যাহত হয় এবং উৎপাদন কমে যায়। ফসলের বৃদ্ধির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে যখন তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দেয়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতিমধ্যেই ফসলের ফলন, গবাদি পশুর স্বাস্থ্য, জলের প্রাপ্যতা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন কমবেশি সব দেশকেই প্রভাবিত করলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বেশি। স্বল্প-আয়ের এই দেশগুলি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য কৃষির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। ক্ষুদ্র কৃষকদের ক্ষেত্রে সেচ সুবিধা, বিমা, উন্নত মানের বীজ এবং আর্থিক সহায়তার সুযোগ প্রায়শই থাকে না। ফলে, জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের মুখে তারা অধিকতর ঝুঁকির শিকার। আফ্রিকার অনেক দেশে মাত্র একটি খরা খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে; এর ফলে খাদ্য আমদানি বৃদ্ধি পায়, পারিবারিক আয় কমে যায় এবং বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব কেবল অর্থনীতির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি দারিদ্র্য বাড়ায়, অপুষ্টির সমস্যাকে আরও প্রকট করে, শিক্ষার সুযোগ কমিয়ে দেয় এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে, সর্বোপরি নারীর বিকাশ ব্যাহত হয়।
সারা পৃথিবীতেই, কৃষকদের এখন ক্রমশ অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ফসল ফলাতে হচ্ছে, সরবরাহ ব্যবস্থা আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে এবং এর মাশুল গুনছেন ভোক্তারা। খরায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি ফসলের মাঠ, প্লাবিত খামার কিংবা তীব্র দাবদাহ— এসবই এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন এক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত মুদি দোকানের রসিদে পণ্যের বাড়তি দাম হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাই এখন আর কেবল অর্থনৈতিক নীতি বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে জলবায়ু অন্যতম প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে। যদি দেশগুলো একই সঙ্গে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন কমানোর পাশাপাশি কৃষিখাতে জলবায়ু-সহনশীল অভিযোজন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী দশকগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা। আজ জলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়; এটি একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির সংকট এবং মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা এবং ক্রয়ক্ষমতার ওপর এক ক্রমবর্ধমান হুমকি।
তাই জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্যপণ্যের দামকে প্রভাবিত করে কিনা— সেই প্রশ্ন এখন আর অবান্তর, এর উত্তর এখন আমাদের খাবারের থালাতেই বিদ্যমান।




