২০০৯ সালে মার্কিন সরকার ঘোষণা করেছিল যে, গ্রিনহাউস গ্যাস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ঘোষণার ওপর ভিত্তি করেই গাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বড় শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি ছিল আইনি ভিত্তি।
এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে চাইছেন। তাঁর প্রশাসনের দাবি, এতে নিয়ম সহজ হবে, গাড়ির দাম কমবে, শিল্পক্ষেত্রে চাপ কমবে এবং অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। শুনতে ভালো লাগলেও বিষয়টি এত সহজ নয়। দূষণ যে ক্ষতিকর, এই সত্য বদলায়নি। সরকার যদি বলে দূষণ আর বিপজ্জনক নয়, তাতে বাস্তবে বায়ু পরিষ্কার হয় না বা পৃথিবীর উষ্ণতা কমে না। শুধু সরকারের দায়িত্ব স্বীকারের ভাষা বদলে যায়।
Advertisement
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আমেরিকা শুধু নিজের জন্য পণ্য তৈরি করে না। তাদের গাড়ি ও শিল্পপণ্য বিশ্বের নানা দেশে বিক্রি হয়। সেই দেশগুলিতে পরিবেশ সংক্রান্ত নিয়ম ক্রমশ কঠোর হচ্ছে। যদি আমেরিকা নিজের দেশে নিয়ম ঢিলেঢালা করে, তবে ভবিষ্যতে তাদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। আজ কিছু খরচ বাঁচানো গেলেও, আগামী দিনে প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে পরিষ্কার জ্বালানি ও কম দূষণকারী প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা কঠিন।
সমর্থকেরা বলেন, কড়া নিয়ম করলে কারখানা অন্য দেশে চলে যায়, যেখানে দূষণ নিয়ন্ত্রণ কম। ফলে মোট দূষণ কমে না, শুধু স্থান বদলায়। এই যুক্তিতে কিছুটা সত্য আছে। কিন্তু তার সমাধান কি নিয়ম তুলে দেওয়া? বরং দরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য চুক্তিতে পরিবেশের মানদণ্ড যুক্ত করা এবং দেশগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। সমস্যার কারণে চোখ বন্ধ করলে সমস্যা দূর হয় না।
Advertisement
এখানে আইনি দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৯ সালের ঘোষণাটি বাতিল হলে ভবিষ্যতে যে কোনও সরকার জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ নিতে চাইলে আইনি বাধার মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ, শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের পথও সংকুচিত হয়ে যাবে। অথচ বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন—তাপপ্রবাহ, বন্যা, দাবানল ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিপদ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন কাগজে-কলমে লেখা কোনও বিষয় নয়, এর প্রভাব আমরা প্রতিদিন দেখছি।
এই বিতর্ক আসলে ব্যক্তি বা দলের লড়াই নয়। এই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ— রাষ্ট্র কি বৈজ্ঞানিক সত্যকে মানবে, নাকি রাজনৈতিক সুবিধাকে প্রাধান্য দেবে? আইন বদলালে বাস্তব বদলায় না। পৃথিবীর তাপমাত্রা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করে না।
দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের শক্তি নির্ভর করে তার দূরদৃষ্টির ওপর। সাময়িক অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য যদি পরিবেশ-সুরক্ষার ভিত্তি দুর্বল করা হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর তার বোঝা বাড়বে। জলবায়ু সঙ্কট কোনও এক দেশের সমস্যা নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেই এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই প্রয়োজন দায়িত্বশীল নীতি, বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। অস্বীকার বা নিয়ম শিথিল করলেই বাস্তবতা বদলে যাবে— এমনটা ভাবা সহজ, কিন্তু তা সত্য নয়।
Advertisement



