পূর্ব প্রকাশিতর পর
কিন্তু নতুন নতুন দেশ দখলের স্বপ্নে বিভোর ফ্যাসিস্ট ইতালিও আশা করেছিল যে সে অস্ত্রের সাহায্যে যুদ্ধোত্তর সমস্যাবলি সমাধানের ক্ষেত্রে জার্মানির পাশাপাশি নিজেকেও মুখ্য স্থানে অধিষ্ঠিত করতে পারবে।
Advertisement
অন্যদিকে, সমরবাদী জাপান এশিয়ায়— এবং তাতে সোভিয়েত দূর প্রাচ্যের বৃহৎ একটি অংশ এবং সমগ্র চীন অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল— নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিল। সে জার্মানির সঙ্গে মিলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল।
Advertisement
যুদ্ধের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অনুসারে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ পরিচালনার সবচেয়ে অমানবিক পদ্ধতিসমূহের আশ্রয় নিয়েছিল: তারা বন্দীদের উপর অত্যাচার করত, শান্তিপূর্ণ বাসিন্দাদের হত্যা করত, নারীদের উপর বলপ্রয়োগ করত, শহরগুলো ধ্বংস করত, সংস্কৃতির স্মৃতিসৌধ বিনষ্ট করত, গ্রাম ও জনপদ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিত।
ইঙ্গো-ফরাসি জোটের তরফ থেকেও যুদ্ধ তার প্রাথমিক পর্যায়ে ন্যায়বিরুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ছিল। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদআধ ঘোষণা করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সরকারগুলো তা শুরু করে আপামর মানুষের স্বার্থে নয়, সেই জাতীয় বুর্জোয়া সম্প্রদায়েরই স্বার্থে, যে-বুর্জোয়া সম্প্রদায় নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করতে ও নিজের মহাজাতিসুলভ অবস্থান সুদৃঢ় করতে চেয়েছিল। সেই জন্যই ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকারগুলো জার্মানি কর্তৃক আক্রান্ত পোল্যান্ডকে বাস্তব সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে বস্তুত পক্ষে কোনকিছুই করেনি। তারা জার্মানির সঙ্গে নতুন এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পৃথিবীতে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষতি সাধন করে জার্মানির সঙ্গে বিরোধ মীমাংসা করতে চেয়েছিল। এতেই নিহিত ছিল তথাকথিত ‘অদ্ভুত যুদ্ধের আসর অর্থ। বস্তুত পক্ষে এ যুদ্ধে মিউনিখ নীতিই অনুসৃত হচ্ছিল এবং তা প্রকৃত পক্ষে জার্মানিকে দুর্বল না করে ক্রমশ কেবল শক্তিশালী করছিল।
যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাসিস্ট জোটবিরোধী রাষ্ট্রসমূহের তরফ থেকে যুদ্ধের সামাজিক-রাজনৈতিক চরিত্র বদলাতে থাকে। এই সমস্ত পরিবর্তন সর্বাগ্রে ঘটে এই কারণে যে ফ্যাসিস্ট আক্রমণের প্রবলতাবৃদ্ধির ফলে অনেকগুলো দেশের জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের প্রতি বাস্তব হুমকি সৃষ্টি হয়। জাতিসমূহ দেখতে পেল যে ফ্যাসিজম তাদের দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করতে প্রয়াসী। কেবল কমিউনিস্টরাই নয়, বহু বুর্জোয়া নেতাও তা বুঝেছিল। সেই জন্যই আপন জাতীয় স্বাতন্ত্রতার জন্য রাষ্ট্রসমূহের সংগ্রাম তাদের তরফ থেকে বিষয়গতভাবে ন্যায় যুদ্ধে পরিণত হচ্ছিল।
ফ্যাসিস্ট জার্মানি আক্রান্ত পোল্যান্ড আর যুগোস্লাভিয়ার জনগণ নিজের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের জন্য, নিজের মেলিক স্বার্থ রক্ষার জন্য একেবারে গোড়া থেকেই ন্যায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। মুক্তি যুদ্ধে লিপ্ত হয় গ্রীস, আলবানিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, আর তার পরে নরওয়ে, হল্যান্ড, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের জনগণ।
কিন্তু যে প্রধান ও চূড়ান্ত কারণটি হিটলারী জোটের রাষ্ট্রসমূহের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিত্রাণমূলক চরিত্র নির্ধারণ করে তা ছিল যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রবেশ। সোভিয়েত জনগণের দেশপ্রেমিক মহাযুদ্ধ (১৯৪১-১৯৪৫) আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে যায় এবং তার কেন্দ্রস্থলে এক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও ফ্যাসিস্ট জার্মানির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
(ক্রমশ)
Advertisement



