আমার কাছে উত্তমকুমার অভিনেতা নন, শ্বশুরমশাই। আমার বাবি। ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে। আজও স্মৃতির খাতায় অমলিন বাবি।
সত্যি কথা বলতে, মানুষটা চলে গেছেন। ২৪ জুলাই মানেই একটা ক্ষতময় দিন। ক্ষতে তো প্রলেপ পড়ে। কিন্তু কিছু শোক কাটিয়ে ওঠা দায়। এই ক্ষত তেমনই। কিন্তু একদিক দিয়ে এখনকার প্রজন্মের সিনেমা বা শিল্পীদের দেখে আমার মনে হয়, উনি গেছেন রাজার মতো। রাজা রাজত্ব করতে করতে চলে গেলে যেমন হয়, সেই রাজার নাম কিন্তু সারা জীবন লেখা হয়ে থাকে। তাঁর আজকের দিনটা সবাই মনে রেখেছে এই কারণেই যে, মানুষটা একেবারে সূর্যের মতো ছিলেন। রঞ্জিতকাকু, মানে রঞ্জিত মল্লিক বললেন, ‘উনি ছিলেন সূর্য। আমরা তো সব স্টার, তারা। ওঁর আলোয় আমরা আলোকিত হই।’ রঞ্জিত মল্লিক এত বড় কথা বলেছেন, আমি এটা মেনে নিতে বাধ্য হলাম। কথাটা বড় সত্যি! উনি মধ্যগগনে, শীর্ষে থাকতে থাকতেই চলে গিয়েছিলেন বলেই আজও সবাই ওঁকে এত ভালোবাসেন।
২৪ জুলাই খুব কষ্টের দিন। আমি ছোটবেলা
থেকে দেখেছি। আমার কাছে আমার বাবা আর উনি একদম এক।
উত্তমকুমার আর হবেন না। কিন্তু আমি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে স্যালুট করি। সত্যি কথা বলতে, বুম্বা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়েছে যাতে এবছর ১০০তম জন্মদিনটা এমনভাবে পালন করতে হবে, সেই সেলিব্রেশনের কথা সারা বিশ্বের মানুষ যেন জানতে পারে। আমি যদি মনে করি, উত্তমকুমারের পর এখনও অবধি এই ইন্ডাস্ট্রিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কে? তাহলে ওর নাম বলব। প্রসেনজিতের সঙ্গে আজকাল প্রায়ই কথা হয়। সে আমাকে বলছে, ‘বৌদি, এটা যদি না করতে পারলাম, তাহলে আমরা অভিনেতা নই। জেঠুকে যদি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলাম, তাহলে আমরা অভিনেতা নই। জেঠু রাজা। সেই রাজার সাম্রাজ্য রেখে রাজা চলে গেছেন। সেই সাম্রাজ্যে আমরা কয়েকজন মন্ত্রী-সান্ত্রী
পড়ে আছি। এই মন্ত্রীরা সেই রাজাকে ভুলে যাব? যে রাজা শুধু দিয়েই গেছেন, দিয়েই গেছেন, দিয়েই গেছেন!’
বাবি আসলে মানুষের মননে আছেন। বাবিকে মনে রেখে এবার তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের তরফে নেওয়া হয়েছে একাধিক পদক্ষেপ।
কেওড়াতলা মহাশ্মশানে উদ্বোধন করা হবে মহানায়কের আবক্ষমূর্তি ও স্মারকফলক। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কেওড়াতলা মহাশ্মশানেই মহানায়কের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল। সেই কারণে এবারে সেখানে তাঁর মূর্তি উদ্বোধন করা হবে। তারপরে মহানায়কের ভবানীপুরের বাসভবনে যাওয়া হবে। সেখানে শ্রদ্ধা জানানো হবে। তারপরে নন্দনে আসা হবে। সেখানে উপস্থিত থাকবেন তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী। তিনিও শ্রদ্ধা জানাবেন। তারপরে বেলা ১১টা নাগাদ আহিরিটোলায় মহানায়কের জন্মস্থান সংলগ্ন উদ্যানে উত্তমকুমারের মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানানো হবে। তারপরে টালিগঞ্জে মহানায়ক উত্তমকুমার মেট্রো স্টেশনের সামনে স্থাপিত উত্তমকুমারের মূর্তিতে মাল্যদান করা হবে।
শিল্পী সংসদ থেকে ঋতুপর্ণা আমাকে ফোন করেছিল। কার্ড পাঠাল। বলল, সন্ধ্যাবেলা আসতেই হবে।
৩ সেপ্টেম্বর এবং ২৪ জুলাই, দুই দিনেই বহু ভক্ত বাড়িতে আসেন। কেউ ছবি আঁকে, ওখানে বসে বসে বাবিকে আঁকে। কেউ বাবিকে নিয়ে গল্প লেখে, কেউ বাবিকে নিয়ে কবিতা লেখে। বিভিন্ন রকমভাবে ওঁকে স্মরণ করা হয়। কত লোক কত বাক্স বাক্স মিষ্টি দিয়ে যায়। বাবির জন্মদিনে একজন ভদ্রলোক মুর্শিদাবাদ থেকে প্রত্যেক বছর ১ হাজার টাকা করে পাঠাতেন। লেখা থাকত, ‘মহানায়ক, আপনার জন্মদিনে আপনার জন্য আমি এইটা পাঠালাম। এটা আপনি আপনার মতো করে খরচা করুন।’ মানুষ এতটা আন্তরিকভাবে ভালোবাসতেন মহানায়ককে।
তিনি আরও জানান, বর্ধমান বাস সিন্ডিকেটের মালিক ছিলেন শরৎচন্দ্র কোনার। ওঁর ন’খানা বাস। প্রত্যেকটা বাসের নাম হচ্ছে ‘মহানায়ক’। আর একটা হচ্ছে সুচিত্রা সেনের নামে— ‘বিশ্ববন্দিতা’। ন’খানা বাসের মধ্যে আটটা মহানায়ক, আর একটা সুচিত্রা সেনের নামে বিশ্ববন্দিতা। বর্ধমান-কালনা-কাটোয়ায় সেসব বাস চলত। ওঁর বাড়ির প্রবেশদ্বারেই একটা বিশাল বড় ছবি। সব জায়গায় উত্তমকুমারের ছবি। শুধু আমি অবাক হয়েছিলাম ওঁর ঠাকুরের আসন দেখে। রামকৃষ্ণ আর বাবি— আর কারও ছবি নেই। বাবিকে তিনবেলা উনি খাবার দিতেন, ভালো করে পাত সাজিয়ে। প্রতিদিন সকালে মিহিদানা— বর্ধমানের মিহিদানা। উনি বর্ধমানের বাসিন্দা। আর দুপুরে ভাত, ডাল, পোস্ত— বাবি যেরকম মাছ খেতে ভালোবাসতেন, সেরকম খাবার। এখন আর মানুষটা নেই।
মানুষটা ভীষণ মজার ছিলেন। মজার গল্প করতেন সারাক্ষণ। ঢুকেই আগে চারদিক দেখে নিতেন কোথায় কী খারাপ হয়ে আছে, কোন জায়গায় কোন সুইচ উল্টো হয়েছে, কোনটা ভেঙে গেছে, কোন আলো জ্বলছে না। সব দেখে উপরে যেতেন। তারপর দেখতেন আসবাবপত্র ঠিকঠাক আছে কি না, সব পরিষ্কার আছে কি না।
সব দেখে-টেখে নিয়ে তারপর আমার শাশুড়ির সঙ্গে গল্প করতে বসতেন। কোনও ছুটি, প্রত্যেক দিনের কী খরচা, কবে কী হবে, কী হবে না, মানে রোজ কী রান্না হচ্ছে, কী খাওয়া হচ্ছে, কী খাওয়া হবে— সবকিছু নিয়ে ভাবতেন। একেবারে একজন প্রকৃত সংসারী পুরুষ যাকে বলে। তবে তিনি কাউকে কখনও বকতেন না। ওঁর শাসনটা অদ্ভুত, ভীষণ অদ্ভুত ছিল। মানে খুব বুঝিয়ে উনি শাসন করতেন। কখনও তেড়ে বকতেন না।
বাবির জীবনে অনেক কষ্টও ছিল। কিন্তু হাসিমুখে সব সামলে নিতেন। ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ দীপঙ্কর দে যে ভূতের রোল-টা করেছিলেন, সেটা কয়েকদিনের মধ্যে একেবারে রপ্ত করে ফেলেছিলেন। কিন্তু ছবি থেকে বাদ পড়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘এই চরিত্রটা আমি করতে পারলাম না।’ ওটা বাবির ভীষণ পছন্দের চরিত্র ছিল।
এখনও উত্তমকুমারের ছবি প্রথম প্রেফারেন্স আমার কাছে ‘ভ্রান্তিবিলাস’। কথায় বলে, মানুষের কাজ থেকে যায়। শিল্পী অবিনশ্বর না হলেও, শিল্প থেকে যায়। মহানায়ক রয়েছেন আপামর বাঙালির মননে।




