নির্মল ধর
৯৮তম অ্যাকাডেমি পুরস্কার এককথায় অস্কার পুরস্কার। আর মাত্র নয়দিন বাদে ১৫ মার্চ রবিবার কাকভোরে অস্কার পুরস্কার অনুষ্ঠান শুরু হবে লসএঞ্জলেস ডলবি থিয়েটারে। যদি না, ইরান বনাম ইউএসএ-ইজরায়েলের চলতি যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী কোনও অঘটন ঘটে। কারণ ক’দিন আগেই একাধিকবার অস্কারজয়ী নায়ক-অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো বলেই ফেলেছেন— ‘‘আমাদের দেশকে বাঁচানোর জন্য ট্রাম্পর থেকে মুক্তি দরকার। ট্রাম্প দেশের শত্রু। ও দেশটাকে শেষ করে ফেলছে। এটাও এক ধরনের অসুস্থতা!’’
Advertisement
আটলান্টিকের পুব পারে যা-ই ঘটুক না কেন, অ্যাকাডেমির সদস্যরা ফেব্রুয়ারির ২৬-২৭ থেকে তাঁদের ব্যালট পাঠাতে শুরু করেছেন। এখন ভোট-গুনতি চলছে! মধ্যপ্রাচ্যের লড়াইকে কি আর সদস্যরা তেমন গুরুত্ব দেবেন! যেমন দেননি সদ্য শেষ হওয়া বার্লিন উৎসবের জুরি চেয়ারম্যান বিশ্বখ্যাত জার্মান পরিচালক উইম ওয়েন্ডার্স! তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ‘উই হ্যাভ টু স্টে আউট অফ পলিটিক্স বিকজ ইফ উই মেক মুভিজ দ্যাট আর ডেলিকেটলি পলিটিক্যাল, উই এন্টার দ্য ফিল্ড অফ পলিটিক্স।’’
Advertisement
মার্কস-ব্রেশট-এর দেশের একজন সচেতন ফিল্ম পরিচালকের এই ভাষ্যে ঝড় উঠেছিল। প্রতিবাদ জানিয়ে লেখিকা অরুন্ধতী রায় ও প্যালেস্টাইনি পরিচালক কৌথের বেন হানিয়া বাল্রিন উৎসব বয়কট করেছিলেন এবং এক প্রতিবাদ-পত্র উৎসব-পরিচালক ত্রিসিয়া টার্টলকে পাঠিয়েছিলেন আশি জন আন্তর্জাতিক ফিল্ম জগতের মানুষ। সদ্য জানা গেল, বার্লিন উৎসব কর্তৃপক্ষ ত্রিসিয়াকে সরাতে সভা ডেকেছে। এদিকে সারা পৃথিবীর অন্তত ১০টি আন্তর্জাতিক উৎসবের পরিচালকরা ত্রিসিয়াকে অপসারণের বিরোধিতা করে দীর্ঘ প্রতিবাদ পত্র পাঠিয়েছেন। এমনকি উৎসবের কয়েকশ কর্মীও ত্রিসিয়াকে সমর্থন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে রবার্ট ডি নিরো-র মন্তব্যের প্রতিধ্বনি স্বভূমিতে হলেও আন্তর্জাতিক হাওয়ায় কোনও ঝড়ের আভাস নেই।
সুতরাং ডলবি থিয়েটার মনোনয়নপ্রাপ্ত শিল্পী ও কলাকুশলীদের ভিড়ে জমজমাট থাকবে এটা ধরেই নেওয়া যায়। যেমনটি ঘটেছিল গত ১০ ফেব্রুয়ারি লস-এঞ্জেলসে বেভারলি হিলস-এর হিল্টন হোটেলে প্রায় সাড়ে তিনশো অতিথি-অভ্যাগতদের ভিড়ে। দিনটি ছিল অস্কার মনোনয়ন ঘোষণা। আর ১৫ মার্চ তো পুরস্কার ঘোষণা এবং অস্কার মূর্তিটি হাতে তুলে দেওয়ার ঝলমলে অনুষ্ঠান!
যাই হোক, এবারের অস্কার প্রতিযোগিতার মূল কাঠামোয় ফেরা যাক। শুকনো তথ্য দিয়েই শুরু করি। দশটি ছবি এবার মনোনয়ন পেয়েছে সেরা ছবির বিভাগে। এবং বাকি বিভাগেও এই ছবিগুলিরই প্রাধান্য! এমনটাই ঘটে থাকে ফি-বছর অস্কার পুরস্কারে। মনোনীত দশটি ছবি হল ‘বুগোনিয়া’ (৪টি মনোনয়ন), ‘এফ-ওয়ান’ (৪), ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ (৯), ‘হ্যামনেট’ (৮), ‘মার্তি সুপ্রিম’ (৯), ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’ (১৩), ‘সিক্রেট এজেন্ট’ (৪), ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ (১৩), ‘সিনার্স’ (১৬) এবং ‘ট্রেন ড্রিমস’ (৪)।
তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ঘটবে পল টমাস এন্ডারসনের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’-এর সঙ্গে রায়ান কুগলারের ‘সির্নাস’-এর। যদিও ড্যানিশ-নরওয়েজিয়ান পরিচালক জোয়াকিম ট্রিয়ারের ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ ১৩টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে পল টমাস ও রায়ানকে একেবারে ধাক্কা দেবে না— বলাও যাচ্ছে না। বিশেষ করে অভিনয় বিভাগে জোয়াকিমের ছবির তিন শিল্পী স্টেলান স্টার্সগার্ড, রেনাতে রিনস্ভ ও ইঙ্গা লিলিয়াস শূন্য হাতে ফিরবেন বলে মনে হচ্ছে না। ছবিটা এই প্রতিবেদকের দেখা।
সহ অভিনেতা হিসেবে স্টেলান স্কার্সগার্দকে সরিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব! তাছাড়া সেরা ছবি হিসেবে ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ মূল বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক বিভাগেও রয়েছে। এবং জোয়াকিম ট্রিয়ারের নাম সেরা পরিচালকের বিভাগেও জায়গা নিয়েছে ‘সির্নাস’ (রায়ান কুগলার), ‘হ্যামনেট’ (ক্লোয়ে ঝাও), ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’ (পল টমাস এন্ডারসন) ও ‘মার্তি সুপ্রিম’ (যোশ সাদিক)-এর সঙ্গে।
সেয়ানে সেয়ানে টক্কর বলতে ‘সির্নাস’ ও ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’-এর লড়াইটাই হবে এবার জমজমাট। কারণ মাত্র ক’দিন আগেই ব্রিটিশ ‘অস্কার’ নামে পরিচিত ‘বাফটা’ পুরস্কারে পলের ছবি ছ’টি আর রায়ানের ‘সির্নাস’ তিনটি পুরস্কার জিতেছে। মনে রাখতে হবে অস্কার পুরস্কারে ‘সির্নাস’ ষোলোটি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে এ পর্যন্ত অস্কার ইতিহাসে রেকর্ড করেছে।
আর ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’ তেরোটি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে ‘ফ্রম হিয়ার টু ইটারনিটি’, ‘শেক্সপিয়র ইন লভ’, ‘ফরেস্ট গাম্প’, ‘শিকাগো’, ‘মেরি পপিন্স’, ‘হুজ অ্যাফ্রেড অফ ভার্জিনিয়া উল্ফ’, ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’ ও ‘কিউরিয়াস কেস অফ বেঞ্জামিন বাটন’-এর রেকর্ড ছুঁয়েছে। এই দুটি ছবির মধ্যে একটি সাদৃশ্য লক্ষ্য করার মতো। পলের ছবিতে উঠে এসেছে ‘ফ্রেঞ্চ ৭৫’ নামে কট্টর বামপন্থী বিপ্লবী দলের হোমড়া চোমড়া নেতা ঘেট্টো প্যাটের অতীত ও বর্তমানের লড়াই কাহিনি।
যদিও ছবিটি আদ্যন্ত কমেডি ঘরানার, থ্রিলার এলিমেন্টসও পাঞ্চ করা। রায়ান কুগলারের ‘সির্নাস’ দেখিয়েছে মিসিসিপি নদীর ব-দ্বীপ এলাকায় তিরিশের দশকে আমেরিকান ব্লুজ-গানের সঙ্গে কালো আমেরিকানদের কেমন ভালোবাসা এবং নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তবে, রায়ানের পরিচালনায় এবং চিত্রনাট্যে ঘৃণা-ভয়-আতঙ্ক অর্থাৎ হরর এলিমেন্টকে এই ছবিতে কিঞ্চিৎ ভয়াল করেই দেখানো হয়েছে।
‘বাফটা’ পুরস্কার এই প্রথম একজন কালো চামড়ার পরিচালককে সেরাত্বের স্বীকৃতি দিল। অস্কার ভোরে কী হয় দেখা যাক! অভিনয়ে নায়ক চরিত্রে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’-এ লিওনার্দো দ্য ক্যাপ্রিওর সঙ্গে ‘সির্নাস’ ছবির দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করা নিগ্রো অভিনেতা মাইকেল বি জর্ডনের টক্কর থাকছেই! পাল্লা ভারী মাইকেলের দিকে। সহ অভিনেতার বিভাগে বেনিচিও দেল তোরো ও সিন পেন-এর চাইতে এগিয়ে রাখা যায় প্রবীণ নরওয়েজিয়ান অভিনেতা স্টেলান সার্কসগার্দকে।
সেরা নায়িকার পুরস্কার দৌড়ে রয়েছেন দু’বার অস্কার (‘লা লা ল্যান্ড’ ও ‘পুওর থিংস’ ) জেতা এম্মা স্টোন, বছর চব্বিশ আগে নমিনেশন পেয়েও অস্কার ছুঁতে না-পারা কেট হাডসন (‘সং সাং ব্লু’র জন্য) এবং ‘হ্যামনেট’ ছবিতে নাট্যকার শেক্সপিয়রের স্ত্রী অ্যাগনেস চরিত্রের অভিনেত্রী জেসিকা বাকলে। তিনি ইতিমধ্যেই ‘বাফটা’র ট্রফি হাতে তুলে নিয়েছেন।
‘হলিউড রিপোর্টার’ ও ‘ভ্যারাইটি’ পত্রিকার হিসেব অনুযায়ী লড়াই হবে এম্মার সঙ্গে জেসিকার। সহ অভিনেত্রীর বিভাগের পাঁচজন নমিনেশন পেলেও ‘সির্নাস’ ছবির অভিনেত্রী উনমি মোসাকু এগিয়ে আছেন ইতিমধ্যেই বাফটা ট্রফি হাতে নিয়ে। অন্য দু’জন হচ্ছেন ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ ছবির এলি ফ্যানিং এবং ইঙ্গা লিলিয়াস! এঁরা দুই বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মঞ্চাভিনেত্রী হিসেবে ছোটবোন নোরার চরিত্রে ইঙ্গাকে এগিয়েই রাখা যায়।
কিন্তু সেরা পরিচালকের পুরস্কার কার হাতে উঠবে! এখানেও লড়াই জমবে ধলো-কালো দুই আমেরিকানের মধ্যে— পল টমাস এন্ডারসন এবং রায়ান কুগলার। আবার বলাও যায় না, দুই বৃহৎ গাছের তলায় থাকা ব্রিটিশ পরিচালক ক্লোয়ে ঝাও হয়তো প্রথম অস্কার পুরস্কার মঞ্চে উঠবেন ‘হ্যামনেট’ ছবির জন্য পুরস্কার নিতে। অঘটন তো অস্কারেই ঘটে। যেমন ঘটেছিল ২০০২-এ। আমেরিকায় ‘অবাঞ্ছিত’ হওয়া সত্ত্বেও ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ ছবির জন্য সেরা পরিচালক নির্বাচিত হন পোলিশ রোমান পোলানস্কি। তিনি কিন্তু যেতে পারেননি। ‘শিকাগো’র পরিচালক রব মার্শাল ব্যাজার মুখে বসেছিলেন দর্শকের আসনে।
তবে এই বছর অরিজিনাল সঙ্গীত পরিচালনায় ‘সির্নাস’ ছবির লুদ্ভিগ গোরানসন এবং একই ছবির গানের (‘আই লাভ ইউ’) জন্য অস্কার প্রাপ্তির সম্ভাবনা বেশি। এবং সিনেমাটোগ্রাফির জন্য ‘সির্নাস’-এর চিত্রগ্রাহক অটাম ডুরান্ড আর্কপ বাকি চারজনের থেকে এগিয়ে। পরিশেষে বলি, ‘অস্কার’ পুরস্কার নিয়ে ‘বাজার’ মাত হওয়ার একটাই অব্যর্থ কারণ— ‘বাজার দখল’। আর পুরস্কার পাওয়ার জন্যও পুঁজি-ব্যবস্থায় ‘মার্কেটিং’ নামক বস্তুটির অনর্থের প্রভাব অনস্বীকার্য। এবছর ভারতীয় অস্কার এন্ট্রি ছিল নীরজ ঘাওয়ানের ‘হোমবাউন্ড’।
এই ছবির অন্যতম প্রযোজক করণ জোহর অস্কারে প্রাথমিক প্রচারের জন্য লস এঞ্জেলেস ও নিউইয়র্ক ঘুরেই মালুম পেয়েছিলেন হলিউডের সমুদ্রে ‘অস্কার’ নামক হাঙ্গরটির দেখা পেতেই কোটি কোটি টাকার রেস্ত প্রয়োজন। নইলে অস্কার স্বপ্নের এক নাম। তাই আর এগোননি।
পুনশ্চ: ‘ভ্যারাইটি’ পত্রিকার সর্বশেষ সমীক্ষা জানাচ্ছে— ‘সির্নাস’ পাবে ৮, ফ্রানকেনস্টাইন – ৩, ‘কেপপ্ ডেমন হান্টার্স’ – ২ এবং ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’ -২’টি করে অস্কার মূর্তি। এবং সেরা আন্তর্জাতিক ছবির অস্কার জিততে পারে রাজনৈতিক কারণেই। জাফর পানাহির ইরানি ছবি ‘ইটস জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’।
Advertisement



