• facebook
  • twitter
Sunday, 18 January, 2026

তৃণমূলকে ‘মহা জঙ্গলরাজ’ কটাক্ষ মোদীর

বাংলা থাকবে তার ‘মেয়ের কাছেই’ পাল্টা জবাব অভিষেকের

দুই দিনের বঙ্গ সফরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গতকাল, অর্থাৎ শনিবার মালদহে দেশের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার এক্সপ্রেস উদ্বোধন করেন তিনি। শনিবারের পর আজ রবিবার  সিঙ্গুরের সরকারি মঞ্চ থেকে হুগলির বলাগড়ে এক্সটেন্ডেড পোর্ট গেট সিস্টেমের শিলান্যাস করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া জয়রামবাটী–বড়গোপীনাথপুর–ময়নাপুর নতুন রেললাইনের উদ্বোধনও এদিন করেন তিনি। পাশাপাশি তিনটি নতুন অমৃত ভারত এক্সপ্রেসের এবং একটি নতুন প্যাসেঞ্জার ট্রেনেরও রবিবার সূচনা করেন মোদী।

এদিন মোদীর সভায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রের দুই মন্ত্রী— সুকান্ত মজুমদার ও শান্তনু ঠাকুর। এছাড়া ছিলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। এদিন বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কৃতিত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেই বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দিয়েছে বলে দাবি করেন মোদী। বাংলা গবেষণাকে আরও এগিয়ে দেবে বলেও এদিন দাবি করেন তিনি। সেই সঙ্গে বিজেপি সরকারের উদ্যোগেই দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা অর্জন করেছেন বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

Advertisement

এর পরেই তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসন কালকে ‘মহা জঙ্গলরাজ’ বলে আক্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  মালদহের পর আরও একবার অনুপ্রবেশ ইস্যুতেও সিঙ্গুর থেকে তোপ দাগেন তিনি। মোদী বললেন, ‘দেশের সুরক্ষা নিয়ে খেলছে তৃণমূল।’ গত কয়েকদিন ধরেই সিঙ্গুরের জমিতে ফের শিল্প গড়ে ওঠা, টাটাদের ফেরানোর আশা দেখাচ্ছিলেন বিজেপির নেতারা। প্রধানমন্ত্রী এদিন তা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না করায় অনেকেই হতাশ।তবে বিনিয়োগের জন্য সঠিক আইনশৃঙ্খলা জরুরি বলেও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন মোদী।

Advertisement

এ দিন সভার শুরুতেই বিহারের প্রসঙ্গ তোলেন মোদী। গত বছর বিহারের মাটিতে গেরুয়া শিবির নিজেদের ঝান্ডা গেড়েছে। সেই কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিহারের জঙ্গলরাজকে আটকে দিয়েছে এনডিএ। এ বার বাংলায় তৃণমূলের মহা-জঙ্গলরাজকে রুখতে হবে।’ তার জন্য নতুন স্লোগানও তিনি বেঁধে দেন, ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপির সরকার।’ হুগলি নদীর দুই ধারে এক সময়ে ছোট- বড় কারখানা গড়ে উঠেছিল। এখন সে সব অতীত। এ দিন মোদী সেই প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের সামর্থ্য অনেক। বড় বড় নদী রয়েছে। বিশাল উপকূলরেখা, উর্বর জমি সবই আছে। তাই সম্ভাবনাও অনেক।’

বাঙালিদের বুদ্ধির প্রশংসাও করেন তিনি। মোদীর কথায়, ‘এখানকার মানুষের বুদ্ধি, প্রতিভা, সামর্থ্য সব রয়েছে।’ কিন্তু বিনিয়োগ হবে কী করে? মোদীর কথায়, ‘বিনিয়োগ তখনই হবে, যখন আইনশৃঙ্খলা ঠিক থাকবে। কলেজে ধর্ষণ আর হিংসায় লাগাম টানতে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনুন। সন্দেশখালির মতো ঘটনা হবে না। হাজার হাজার শিক্ষক চাকরি হারাবেন না।’ বাংলায় বিজেপি সরকারে এলে ‘এক জেলা, এক পণ্য’ নীতি চালু করা হবে বলেও এ দিন জানান প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ কোনও জেলার বিশেষ বা ঐতিহ্যবাহী পণ্য নিয়ে সে গুলির উৎসাহ বা প্রসারে সাহায্য করা। মোদী বলেন, ‘এই জেলায় ধনেখালি শাড়ি আছে, পাট আছে, হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সামগ্রী রয়েছে। সেগুলিকে উৎসাহ দেওয়া হবে।’ প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে কড়া নীতি এনে পাট শিল্পকে চাঙ্গা করার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলিকে বাংলায় ঢুকতে দেওয়া হয় না বলে বারবার অভিযোগ করে বিজেপি। এ দিন মোদীর মুখেও সেই একই কথা শোনা গেল। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলার মা-বোনদের সেবা করতে চাই। কিন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পকে আপনাদের কাছে পৌঁছতে দেয় না।’ এর পরেই কিছুটা কটাক্ষের সুরে তিনি বলেন, ‘আমি বারবার এই রাজ্যের সরকারকে চিঠি পাঠাই। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী আমার চিঠি পড়েন না। অন্তত অফিসারদের তো পড়তে দিন।’ কেন্দ্রীয় সরকারের পিএম মৎস্য সম্পদ যোজনা প্রকল্পে বাংলার জেলেরা রেজিস্ট্রেশন করতে পারছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। মোদীর কথায়, ‘তৃণমূল রাজ্যের মৎস্যজীবীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করছে।’

শুক্রবার মালদার সভা থেকেও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তৃণমূলকে নিশানা করেছিলেন মোদী। এ দিনও এই নিয়ে তোগ দেগে মোদী বলেন, ‘তৃণমূল দেশ ও রাজ্যের সুরক্ষা নিয়ে খেলা করছে।’ রাজ্যের তরুণদের সতর্ক থাকার বার্তা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘তৃণমূল এখানে অনুপ্রবেশকারীদের অনেক সুবিধা দেয়। তাদের বাঁচাতে ধরনায় বসে। আসলে অনুপ্রবেশকারীরা ওদের ভোটব্যাঙ্ক। তাই এত পছন্দ। এদের বাঁচাতে তৃণমূল যে কোনও পর্যায়ে যেতে পারে।’

মোদীর বেঁধে দেওয়া স্লোগান ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপির সরকার‘-এর জবাব দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার হুগলির সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রীর সভা শেষ হওয়ার আগেই নদিয়ার রোড শো থেকে অভিষেক বলেন, এবারও বাংলা থাকবে তার ‘মেয়ের কাছে’ই। সিঙ্গুরে মোদীর ভাষণ শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই ভাষণ দিতে শুরু করেন অভিষেক।

সেখানেই নতুন স্লোগান নিয়ে মোদীকে কটাক্ষ করেন তিনি। কটাক্ষ করে বলেন, ‘কাল মোদীজি বলেছেন, পাল্টানো দরকার। বাংলার মানুষকে আপনারা শাস্তি দিয়ে পাল্টাতে চান। আমি একমত আপনার সঙ্গে, পাল্টানো দরকার। বাংলার মানুষ পাল্টাবে না, পাল্টাবেন আপনারা। পাল্টাবে দিল্লি-গুজরাতের বহিরাগতেরা। যারা আগে জয় শ্রীরাম বলে সভা শুরু করত, এখন তারাই জয় মা কালী আর জয় মা দুর্গা বলে সভা শুরু করে। বাংলার মানুষ আপনাদের কাছে মাথা নত করবে না।’

পাশাপাশি, নদিয়ার রোড শো থেকে বিজেপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন অভিষেক। তাঁর দাবি, তেহট্টের এক বিজেপি নেত্রী নর্দমা তৈরির নামে দলের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অন্য এক গ্রাম পঞ্চায়েতের নয়ছয় করেছেন ১০০ দিনের কাজের টাকা। গত লোকসভা ভোটে কৃষ্ণনগর কেন্দ্রে তৃণমূলের মহুয়া মৈত্রের কাছে ৫৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত বিজেপির প্রার্থী অমৃতা রায় তাঁর দলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছিলেন, তা-ও স্মরণ করিয়ে দেন অভিষেক। মোদীর স্লোগানের পাল্টা হিসাবে অভিষেক বলেন, ‘আগের বার বলেছিলাম, বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়। এ বার বলছি, মেয়ের কাছেই থাকবে বাংলা, যতই কর হামলা, পারলে এবার মোদীবাবু দিল্লি সামলা।’

 

Advertisement