• facebook
  • twitter
Friday, 6 March, 2026

যুদ্ধের আগুনে তেলের বাজার

তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছলে তার প্রভাব শুধু পেট্রোলপাম্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ— সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে।

তেলবাহী জাহাজে হামলার মুহূর্তের চিত্র।

পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে নতুন সামরিক উত্তেজনা আবার বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর এক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে— তেলের দাম কোথায় গিয়ে থামবে? যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফল এখনো অনিশ্চিত, কিন্তু বাজার ইতিমধ্যেই অস্থির। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের দিকেও যেতে পারে।

তবে এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। সবকিছু নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন চলবে তার উপর। সাম্প্রতিক অতীতে এর একটি উদাহরণ আছে। গত বছর ইরান-ইজরায়েল সংঘর্ষ মাত্র বারো দিন স্থায়ী হয়েছিল। সেই সময় তেলের দাম সাময়িকভাবে ৭০ ডলারের নিচে থেকে প্রায় ৮০ ডলারে উঠলেও পরে আবার কমে আসে। কিন্তু যদি সংঘর্ষ দীর্ঘায়িত হয়, পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন হতে পারে।

Advertisement

ইতিমধ্যেই বাজারে ‘যুদ্ধ প্রিমিয়াম’ যোগ হতে শুরু করেছে। সংঘর্ষ শুরুর আগেই তেলের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছিল এবং প্রায় ৭২ ডলার ছুঁয়েছিল। যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়তেই তা দ্রুত আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম ১০০ ডলার ছুঁয়ে ফেলতে পারে— যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুতর সংকেত।
এই আশঙ্কার মূল কারণ পশ্চিম এশিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালী। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। যদি যুদ্ধের কারণে এই পথ বন্ধ হয়ে যায় বা জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তবে বিশ্ববাজারে সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগবে।

Advertisement

এই সংকট তিনভাবে বিশ্ব তেলবাজারকে আঘাত করতে পারে। প্রথমত, ইরানের হামলার আশঙ্কায় তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে না-ও পারে। দ্বিতীয়ত, ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলির তেলক্ষেত্র বা পরিশোধনাগারকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। তৃতীয়ত, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর মতো ইরানের মিত্র শক্তি আবার লোহিত সাগরের নৌপথে হামলা শুরু করলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও বিপর্যস্ত হতে পারে।

এর ফলে শুধু তেলের সরবরাহই নয়, পরিবহন খরচও বেড়ে যাবে। যদি জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ দিক ঘুরে যেতে হয়, তবে ভাড়াই ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ তেলের দামের ওপর চাপ শুধু উৎপাদন ঘাটতির জন্য নয়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণেও তৈরি হবে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছে এশিয়ার বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলি, বিশেষ করে ভারত ও চিন। এই দুই দেশের সম্মিলিত দৈনিক তেল চাহিদার সমান পরিমাণ তেল প্রতিদিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প জোগান পাওয়া সহজ নয়।

ভারতের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ভারত ধীরে ধীরে রাশিয়ান তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে এবং আবার পশ্চিম এশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে, বিশেষত ইরাক ও সৌদি আরবের ওপর। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা বাড়লে ভারতের আমদানি বিল ও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়বে।

তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছলে তার প্রভাব শুধু পেট্রোলপাম্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ— সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে। এর সরাসরি ফল হলো মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি। বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, তেলের দাম এইভাবে বাড়লে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ০.৬ থেকে ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

মূল্যবৃদ্ধি বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যায়। অনেক দেশ তখন সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়, যার ফলে বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় কমে যায়। তার ওপর যদি ডলার আরও শক্তিশালী হয়— যা সাধারণত এমন সংকটের সময় ঘটে— তবে আমদানিনির্ভর দেশগুলির অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে।

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি অন্ধকারও নয়। বড় শক্তিগুলির হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র রয়েছে— কৌশলগত তেল মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কয়েকশো মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে এবং চিনের মজুত আরও বেশি। এই মজুত বাজারে ছাড়া হলে সাময়িকভাবে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। বিশেষত চিন যদি উচ্চ দামের সময় মজুত ব্যবহার করে বাজার থেকে কম তেল কেনে, তবে বিশ্ববাজারে চাহিদা কিছুটা কমবে এবং দাম বাড়ার চাপও কিছুটা কমতে পারে।

অতএব, তেলের বাজার এখন সম্পূর্ণভাবে ভূ-রাজনীতির বন্দি। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে বাজার আবার স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু সংঘর্ষ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তার অভিঘাত শুধু পশ্চিম এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তার ঢেউ পৌঁছে যাবে বিশ্বের প্রতিটি অর্থনীতিতে। এই কারণেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, যুদ্ধ কতদিন চলবে। কারণ তার উত্তরেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের তেলের দাম এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।

Advertisement