• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 30 June, 2026

হেল্পলাইন নম্বরে কি ভাঙন ঠেকানো যাবে? দলের অন্দরেই প্রশ্নের মুখে অভিষেকের নতুন কর্মসূচি

তৃণমূলে ভাঙন আর সিআইডি তদন্তের আবহে ফের হেল্পলাইন চালু করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কালীঘাটে কী চলছে, রইল পুরো বিশ্লেষণ।

হেল্পলাইন নম্বরে কি ভাঙন ঠেকানো যাবে? দলের অন্দরেই প্রশ্নের মুখে অভিষেকের নতুন কর্মসূচি

Abhishek Banerjee (File Pic)

রাজ্যের ক্ষমতা হাতছাড়া হয়েছে প্রায় দু’মাস। তারই মধ্যে মঙ্গলবার সমাজমাধ্যমে এক পোস্টে পুরনো অস্ত্র নতুন করে শান দিলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। ঘোষণা করলেন, রাজনৈতিক কারণে ঘরছাড়া, নিপীড়িত বা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়া তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে ফের চালু হচ্ছে এক ডাকে অভিষেক। যোগাযোগের জন্য নতুন একটি নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে।

কর্মসূচিটা একেবারেই নতুন নয়। ২০২২ সালে ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের বাসিন্দাদের অভাব-অভিযোগ শুনতে প্রথম এই হেল্পলাইন চালু হয়েছিল, পরে তা গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আরজি কর কাণ্ডের পরে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্যও একই ব্র্যান্ডে আলাদা হেল্পলাইন খুলেছিলেন অভিষেক। অর্থাৎ সংকটের সময়েই বারবার এই নামটাকে হাতিয়ার করেছেন তিনি। এ বার সেই তালিকায় যোগ হল দলের কর্মীদের আইনি সহায়তা।

 

প্রশ্ন হল, এই মুহূর্তেই কেন। উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে গত দু’মাসের ঘটনাপ্রবাহে। বিধানসভা ভোটে হারের পরে তৃণমূলে যে ভাঙন শুরু হয়, তা থামেনি। লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনই দল ছেড়ে এনসিপিআই নামের নতুন একটি সংগঠনের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আবেদন জমা দেন লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থেকে যান মাত্র আটজন সাংসদ, যে তালিকায় অভিষেক নিজেও আছেন। বিধানসভাতেও একই রকম অস্থিরতা। বিরোধী দলনেতা পদে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মনোনয়নে সইয়ের জালিয়াতি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে দলের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা সরাসরি অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ জানান। তার জেরে দল থেকে বহিষ্কৃত হন দু’জনেই। কিন্তু তৃণমূলের টিকিটে জেতা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থনপত্র নিয়ে অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুর কাছে হাজির হন ঋতব্রত, এবং শেষমেশ তাঁকেই বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসাবে স্বীকৃতি দেন অধ্যক্ষ। প্রকাশ্যেই তিনি জানিয়ে দেন, বিধানসভার সঙ্গে অভিষেকের কোনও সম্পর্ক নেই। তাই অভিষেকের দেওয়া চিঠির কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই।

এই গোটা সইজালিয়াতি বিতর্কেই মূল অভিযুক্ত হিসাবে নাম জড়িয়েছে অভিষেকের। সিআইডির (CID) তলব পেয়ে কলকাতা হাইকোর্টে গিয়ে গ্রেপ্তারি থেকে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ পান তিনি, তারপর জুনের ১১ এবং ১৪ তারিখে দুই দফায় পাঁচ ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। তদন্তের সূত্রেই কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে তল্লাশি চালায় সিআইডি, যা ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হয়। এর আগে মে মাসে সোনারপুরে নিহত এক তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে মারাত্মক বিক্ষোভের মুখে পড়েন অভিষেক।

এই প্রেক্ষাপটেই এক ডাকে অভিষেকের প্রত্যাবর্তনকে নিছক সহায়তা কর্মসূচি হিসাবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের ব্যাখ্যা, বিধানসভায় কার্যত কোণঠাসা, সাংগঠনিক ভাবে আক্রমণের মুখে থাকা অভিষেকের এই মুহূর্তে দলের সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ধরে রাখার একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার ছিল, যেটা ঋতব্রত-শিবির কেড়ে নিতে পারবে না। তবে দলের অন্দরেই এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্রোহী বিধায়ক আখরুজ্জামানের মন্তব্য, শুধু ফোন নম্বর দিয়ে কর্মীদের পাশে থাকা সম্ভব নয়, সংগঠন চাঙ্গা করতে হলে সরাসরি মাটিতে নামতে হবে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই কর্মসূচিকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি।

ভোট-পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের রাজ্যজোড়া কোনও বড় আন্দোলন এখনও চোখে পড়েনি, ধর্মতলায় মমতার ধর্না-মিছিল ছাড়া। এই শূন্যতার মধ্যেই পুরনো ব্র্যান্ড ফিরিয়ে অভিষেক বার্তা দিতে চাইছেন, সংকটেও তিনি কর্মীদের পাশে আছেন। তবে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই উদ্যোগ তৃণমূলের ভাঙন ঠেকাতে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার।