কালীপুজো ও দীপাবলির আগে বাজি বাজারে কার্যত অন্ধকার। লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গাফিলতি এবং বাজি ক্লাস্টার তৈরি না হওয়ায় সঙ্কটে রাজ্যের বাজি ব্যবসায়ীরা। গত সরকারের আমল থেকেই ক্লাস্টার তৈরির কথা বলা হলেও এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
অভিযোগ, তিন মাসের জন্য বাজি বিক্রির লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াও থমকে রয়েছে। ফলে উৎসবের মরসুমে ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন কয়েক হাজার ব্যবসায়ী।
অথচ প্রতি বছরের মতো এবারও দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটির হারাল বাজি বাজারে ভিড় উপচে পড়ছে। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলা থেকে বাজি কিনতে আসছেন ক্রেতারা। কয়েক কিলোমিটার জুড়ে অস্থায়ী ও স্থায়ী দোকানে সাজানো হয়েছে নানা ধরনের আতশবাজি।
বাজারে পদ্মফুল ও ‘অপারেশন সিঁদুর’ আতশবাজির চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তবে বারুদ ও রাসায়নিকের দাম বাড়ায় বাজির দামও বেড়েছে। ফলে ভিড় থাকলেও অনেক ক্রেতাই আগের তুলনায় কম বাজি কিনছেন।
পরিবেশ ও নিরাপত্তার কারণে ফানুস বিক্রি ও ওড়ানোর উপরেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
তবে হারালের বাজারে নিষিদ্ধ শব্দবাজির গোপন কারবার নিয়েও অভিযোগ উঠছে।
প্রকাশ্যে দোকানে নিষিদ্ধ বাজি না রাখলেও ক্রেতার পরিচয় যাচাই করে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চকলেট বোমা বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এক বিক্রেতার দাবি, ক্রেতাদের চাহিদার চাপেই আড়ালে এই কারবার চালাতে হচ্ছে।
দীপক সরকার(বাজি ব্যবসায়ী) জানিয়েছেন, অন্যান্য বছর পশ্চিমবঙ্গে বিক্রি হওয়া বাজির প্রায় ৬৫ শতাংশই রাজ্যে তৈরি হত। এ বার তা কমে ২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ফলে জোগানের জন্য তামিলনাড়ুর উপর নির্ভর করতে হবে। এতে পরিবহণ ও অন্যান্য খরচ বাড়বে। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পড়বে বাজির দামে।
পরিসংখ্যানেও সঙ্কটের ছবি স্পষ্ট। গত বছর রাজ্যে ১৬৩টি বাজি বাজার এবং ৯৮টি বাজি মেলা হয়েছিল। এ বছর সেই সংখ্যা কমে ১২-তে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। বহু ব্যবসায়ী এখনও বিক্রির লাইসেন্স না পাওয়ায় আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন। ব্যবসা বন্ধ থাকলে একাংশ বেআইনি পথে বাজি বিক্রি করতে পারেন বলেও আশঙ্কা।
শব্দবাজির মাত্রা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ব্যবসায়ীদের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ১২৫ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দের বাজি ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকারের হাতে শব্দের মাত্রা মাপার পর্যাপ্ত যন্ত্র নেই। ফলে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা হচ্ছে কি না, তা চিহ্নিত করা কঠিন।
গত বছর বাজির মরসুমে দমকল, পুলিশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে নিয়ে বৈঠক হয়েছিল। মাত্রাতিরিক্ত শব্দবাজি নিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এ বছর এখনও তেমন কোনও বৈঠক হয়নি বলে সূত্রের খবর।
বাজি ব্যবসায়ী জগজ্জ্যোতি গায়েনের দাবি, গত বছর এই মরসুমে রাজ্যের বাজি ব্যবসার অঙ্ক ছিল প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এ বার তা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে চলতি বছরের সম্ভাব্য ব্যবসার অঙ্ক নিয়ে ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাবেও স্পষ্টতা প্রয়োজন।
সারা বাংলা আতশবাজি উন্নয়ন সমিতির চেয়ারম্যান বাবলা রায়ের কথায়, “রাজ্য জুড়ে ৩১ লক্ষ বাজি ব্যবসায়ী এ বছর ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছেন। রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন, এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হোক।”
বাজী ব্যবসায়ী কমল নাথ জানিয়েছেন, দ্রুত লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাজি ক্লাস্টার তৈরির কাজও শুরু করতে হবে। নইলে কালীপুজো ও দীপাবলির মরসুমে রাজ্যের বাজি শিল্পের সঙ্কট আরও গভীর হবে।




