চাকরি না পেয়ে হতাশা, মানসিক ভারসাম্য হারানো, তারপর হঠাৎ নিখোঁজ! দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ ছিল না ওড়িশার এক মেধাবী যুবকের। অবশেষে মিশনারিজ অফ চ্যারিটি ও হ্যাম রেডিওর যৌথ উদ্যোগে কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরলেন তিনি। বারুইপুরের নির্মল হৃদয় থেকে তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন দাদা। দীর্ঘদিন পর ভাইকে ফিরে পেয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত গত জুলাই মাসে। হাওড়া স্টেশন চত্বরে খাবারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই যুবক। তাঁকে উদ্ধার করেন রেল পুলিশ ও কয়েক জন যাত্রী। পরে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে রেল পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ হয় মিশনারিজ অফ চ্যারিটির। সংস্থার কালীঘাট শাখা তাঁকে নিজেদের দায়িত্বে নেয়। প্রয়োজনীয় নথিভুক্তির পর শুরু হয় চিকিৎসা।

এর পর তাঁকে বারুইপুরে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির অন্য একটি শাখা নির্মল হৃদয়ে পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর শারীরিক ভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু মানসিক ভারসাম্য হারানোর কারণে স্মৃতিশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নিজের নাম-পরিচয়, বাড়ির ঠিকানা কিংবা পরিবারের বিষয়ে কিছুই জানাতে পারছিলেন না।
ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস জানান, হাওড়া স্টেশন চত্বরে আগে একটি হোটেল ছিল। সেটি এখন আর নেই। বর্তমানে খাবারের অপেক্ষায় বহু মানুষ ওই এলাকায় বসে থাকেন। খাবার না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও আগেও ঘটেছে। এই যুবককে উদ্ধারের পর রেল পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। সেই সময় মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারাই যুবককে নিজেদের দায়িত্বে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।
দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরেও যুবকের পরিচয় জানা সম্ভব না হওয়ায় মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সদস্য খোকন মণ্ডল হ্যাম রেডিওর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শুরু হয় পরিবারের খোঁজ। যুবক ওড়িয়া ভাষায় কথা বলতেন। তাই তাঁর পরিচয় উদ্ধারে ওড়িশায় বিশেষ ভাবে অনুসন্ধান চালানো হয়। তাঁর ছবি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে ওড়িশার বালেশ্বর জেলার সহদেব কুন্ত গ্রামের সন্ধান মেলে। খোঁজ পাওয়া যায় তাঁর দাদা বাসুদেব সাহার।

ছবি দেখেই নিজের ছোট ভাইকে চিনতে পারেন বাসুদেব। জানা যায়, ওই যুবক পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ওড়িশার সরকারি বোর্ডের অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা শেষ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য র্যাঙ্ক হোল্ডারও ছিলেন তিনি। কিন্তু উচ্চশিক্ষার পরেও চাকরি না মেলায় ধীরে ধীরে মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন। একসময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। পরিবারের তরফে স্থানীয় থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল। কিন্তু এত বছর তাঁর কোনও সন্ধান মেলেনি।
অবশেষে শনিবার বারুইপুরের নির্মল হৃদয়ে পৌঁছন বাসুদেব। মিশনারিজ অফ চ্যারিটির কাছ থেকে ভাইকে নিজের দায়িত্বে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। দীর্ঘদিন পর দাদাকে চিনতে পারলেও নিজের বাড়ির ঠিকানা বলতে পারেননি ওই যুবক। অন্যদিকে, ছেলেকে ফিরে পাওয়ার খবর পেয়ে অসুস্থ মা-ও অত্যন্ত খুশি বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
ভাইকে ফিরে পেয়ে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাসুদেব। তাঁর ভাইকে যে যত্ন ও ভালোবাসায় রাখা হয়েছে, তার জন্য সংস্থার সদস্যদের ধন্যবাদ জানান তিনি। অম্বরীশ নাগ বিশ্বাসের কথায়, প্রযুক্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা একটি পরিবারকে ফের এক করতে পেরে তাঁরাও অত্যন্ত আনন্দিত।




