• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 30 October, 2026

জামিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের জয়,দীর্ঘ ২০ বছর পর হতে চলেছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন, ২০২৭ হবে ভোট

২৯ অক্টোবর অর্থাৎ গতকাল গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের জারি করা নির্দেশের পরই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় পড়ুয়ারা। একই সঙ্গে শেষ হয় অনশনও

জামিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের জয়,দীর্ঘ ২০ বছর পর হতে চলেছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন, ২০২৭ হবে ভোট

Image Source: X

দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে সাফল্য। তিন সপ্তাহের আন্দোলনের ইতি টানল জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jamia Millia University) পড়ুয়ারা। পড়ুয়াদের দাবি মেনে ২০২৭ সালে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে সম্মত হল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২৯ অক্টোবর অর্থাৎ গতকাল গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের জারি করা নির্দেশের পরই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয় পড়ুয়ারা। একই সঙ্গে শেষ হয় অনশনও। প্রায় ২০ বছর পর ফেল ছাত্র সংসদ নির্বাচন হতে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। একে আন্দোলনের জয় হিসেবেই দেখছেন পড়ুয়ারা।

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jamia Millia University) গালিবের মূর্তির নীচে গুলিস্তান-ই-গালিব চত্বরে রেজিস্ট্রারের নির্দেশ পড়ে শোনানো হয়। কিছুক্ষণের নীরবতার পরই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। হস্টেল থেকে বেরিয়ে এসে ছাত্র ঐক্যের স্লোগান দিতে থাকেন তাঁরা। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকা ৭ নম্বর গেটও খুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে পুলিশকেও সরিয়ে নেওয়া হয়।

আন্দোলনকারীদের অন্যতম পড়ুয়া এবিন বাসিল টানা ১৮ দিন অনশন করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের সমস্ত দাবি মেনে নিয়েছে। আর এক আন্দোলনকারী জাভাধ জানান, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তার সকলের সঙ্গে আলোচনার করেই ঠিক করা হবে। আরেক সংগঠক হানিনা বলেন, যাঁরা ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে খাবার, নিরাপত্তা ও পানীয় জলের অভাব সত্ত্বেও ক্যাম্পাসে আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছেন, এই জয় তাঁদের সকলের।

২৯ অক্টোবরের নির্দেশে কী বলা হয়েছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jamia Millia University) রেজিস্ট্রারের নির্দেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সারে ১৫ মে-র মধ্যে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সংবিধান অনুমোদন ও কার্যকর করতে হবে।

২০২৭ সালেল শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার ছয় সপ্তাহের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করাতে হবে। নির্বাচন হবে লিংডোহ কমিটির সুপারিশ মেনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ ২০২৭ সালের ১৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়ার কথা। সেই হিসাবে ছয় সপ্তাহের সময়সীমা শেষ হবে ২৬ আগস্ট। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনও নির্দিষ্ট নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেনি।

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত শো-কজ নোটিস, শৃঙ্খলাভঙ্গ সংক্রান্ত তদন্ত, বহিষ্কার, সাসপেনশন এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আন্দোলন ও অনশন অবিলম্বে প্রত্যাহারের জন্য পড়ুয়াদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jamia Millia University) নির্দেশে জানানো হয়েছে, পড়ুয়াদের দেওয়া একটি চিঠি বিবেচনা করেই সংবিধান তৈরি, নির্বাচন আয়োজন এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: সাউথ সিটি কমপ্লেক্সে আগুন, ২৮ তলার ফ্ল্যাটের আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে ৭টি ইঞ্জিন, আগুন নেভানোর কাজ চলছে

আগের নির্দেশের সঙ্গে নতুন সিদ্ধান্তের পার্থক্য কোথায়?

এর ঠিক তিন দিন আগে, ২৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি নির্দেশ জারি করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ছাত্র সংসদের সংবিধান অনুমোদিত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন করাতে হবে। কিন্তু নির্বাচনের জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।

এই নির্দেশে সন্তুষ্ট হননি আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি ছিল, ২০২৬ সালের ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে ছাত্র সংসদের সংবিধান অনুমোদন করতে হবে। নতুন নির্দেশে সংবিধান অনুমোদনের সময়সীমা আরও পিছিয়ে ২০২৭ সালের ১৫ মে করা হয়েছে। তবে এবার শিক্ষাবর্ষ শুরুর ছয় সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন করানোর নির্দিষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, ছাত্রদের প্রাথমিক দাবি পুরোপুরি পূরণ না হলেও আগের প্রস্তাবের তুলনায় নতুন নির্দেশে নির্বাচনের সময়সীমা অনেক বেশি স্পষ্ট। সেই কারণেই আন্দোলনকারীরা এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের জয় বলে মনে করছেন।

কীভাবে শুরু হয়েছিল আন্দোলন?

গত ১১ অক্টোবর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (Jamia Millia University) আন্দোলন শুরু হয়। পরের দিন, ১২ অক্টোবর থেকে অনশনে বসেন পড়ুয়ারা। ১৮ অক্টোবর ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২১ অক্টোবর ছাত্র সংসদের সংবিধান তৈরির জন্য একটি প্যানেল গঠন করা হয়। ওই প্যানেলকে ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এর মধ্যেই আন্দোলনের ব্যাপকতা বাড়তে থাকে। গালিব লনে ছাত্রদের সাধারণ সভায় কয়েকশো পড়ুয়া যোগ দেন। ২৩ অক্টোবর শুক্রবার ক্যাম্পাসের কাছে কংগ্রেস সাংসদ ইমরান মাসুদ-সহ ১০ জনকে আটক করে পুলিশ। ২৪ অক্টোবর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস অনলাইনে চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২৬ অক্টোবর আধাসেনার সঙ্গেও আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তি হয়।

২০ বছর ধরে কেন ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি?

২০০৬ সালে ক্যাম্পাসে হিংসাত্মক পরিস্থিতি ও পঠনপাঠনে বিঘ্ন ঘটার কারণে জামিয়ার ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে আর নির্বাচন হয়নি।সেই ২০০৬ সালেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার জে এম লিংডোহের নেতৃত্বাধীন  একটি কমিটি তৈরি করা হয়। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের বয়সসীমা, নির্বাচনী প্রচারের খরচের ঊর্ধ্বসীমা, ন্যূনতম উপস্থিতি এবং প্রার্থীদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বজায় রাখার মতো একাধিক নিয়মের সুপারিশ করা হয়েছিল ওই কমিটিতে।

জামিয়ার ছাত্র সংসদের সংবিধান তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেলকে ২০০৬ সালে ছাত্র সংসদ বিলুপ্তির ঘটনা, আদালতের বিভিন্ন নির্দেশ এবং লিংডোহ কমিটির সুপারিশ খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া আইন, ১৯৮৮-এর ২৩ (J) ও (K) ধারার অধীনেই এই প্যানেল কাজ করছে। নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, ছাত্র সংসদ নির্বাচন লিংডোহ কমিটির নিয়ম মেনেই হবে। ফলে প্রার্থীদের বয়স, নির্বাচনী খরচ এবং আচরণবিধির বিষয়গুলি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন: RSS ঘাঁটি নাগপুরে কংগ্রেসের জয়, মোদীর কটাক্ষের পাল্টা জবাব দিল হাত শিবির

সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?

আন্দোলনের অবসান ঘটলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন বাস্তবায়নের পথে বেশ কয়েকটি চ্যালঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, নির্বাচনের জন্য এখনও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। ২০২৭ সালের ১৫ মে-র মধ্যে সংবিধান অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। তার পর জুলাইয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলে ছয় সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। অর্থাৎ, আন্দোলন শুরুর প্রায় ন’মাস পর নির্বাচন হবে।

দ্বিতীয়ত, ছাত্র সংসদের সংবিধান এখনও চূড়ান্ত হয়নি। খসড়া তৈরির সময় পড়ুয়াদের মতামত নেওয়ার কথা রয়েছে। সংবিধানের বিভিন্ন ধারা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হলে গোটা প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে।

তৃতীয়ত, লিংডোহ কমিটির সুপারিশ নিয়েও বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রার্থীদের বয়সসীমা ও ক্লাসে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা কিছু পড়ুয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ ছাড়াও নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা নিয়ে যে তদন্তের কথা ২৬ অক্টোবরের নির্দেশে জানানো হয়েছিল, তার নিষ্পত্তি এখনও বাকি। আন্দোলনকারীদের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছিলেন।

নতুন নির্দেশে এই বিষয়গুলির কোনও উল্লেখ নেই।ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটলেও, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার।

দেখুন: