ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পরেই দেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে গিয়েছেন দক্ষিণপন্থী রাজনীতিক ফ্লাভিও বলসোনারো (Flavio Bolsonaro)। ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠপুত্র ফ্লাভিওর আমেরিকা সফর ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে আমেরিকায় প্রবেশের জন্য ভিসা দেবে বলে মার্কিন বিদেশ দপ্তরের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন বলেও খবর। যদিও রাজনৈতিক আশ্রয় মঞ্জুর হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ব্রাজিলে ফ্লাভিওর (Flavio Bolsonaro) বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলছে। তার মধ্যেই তাঁর দেশ ছাড়া এবং আমেরিকায় যাওয়ার ঘটনায় দুই দেশের রাজনৈতিক মহলে চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘ও গ্লোবো’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লাভিওকে (Flavio Bolsonaro) মায়ামিতে স্বাগত জানান তাঁর ছোট ভাই এডুয়ার্দো বলসোনারো। বাবার হয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন এডুয়ার্দো। সেই উদ্দেশ্যে গত বছর থেকেই আমেরিকায় রয়েছেন তিনি। গত জুনে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে অবৈধভাবে তদ্বির করার অভিযোগে এডুয়ার্দোকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই চার বছর দু’মাসের কারাদণ্ড দেয় ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট। চলতি মাসের গোড়ায় এক পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, ফ্লাভিও নির্বাচনে জিততে না পারলে তাঁর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: ইজরায়েলে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন নেতানিয়াহু? সরকার গঠনে নির্ণায়ক হবে কি আরব দলগুলি?
ফ্লাভিওর আমেরিকা সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কারণে। অর্থ পাচারের তদন্তের অংশ হিসেবে আদালত তাঁকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি। ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তবে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নির্বাচনের ফলাফলের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরেই তাঁকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। যদিও পরে তাঁর দল নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা ঘোষণা করে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ব্রাজিলের নির্বাচনের ফল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। এক সংবাদসংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লাভিওকে আমেরিকায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার কথা স্বীকার করে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আমিই অনুমোদন দিয়েছি। আমার মনে হয় ওঁরা ভাল মানুষ।’ ব্রাজিলের নির্বাচনকে ‘অদ্ভুত’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভোটের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ট্রাম্প। তবে নির্বাচনে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ মেলেনি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলিতে জানানো হয়েছে। ভোটের সময় বাড়ানোর ফলে ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছিল এমন দাবিরও ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা ফ্লাভিওর দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তকে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও প্রার্থী দেশ ছেড়ে চলে গেলে তাঁর কিছু লুকোনোর আছে বলে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। লুলা আরও বলেন, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ফ্লাভিওর ব্রাজিলেই থাকা উচিত ছিল। অন্যদিকে, আমেরিকার ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি জোয়াকিন কাস্ত্রো প্রশ্ন তুলেছেন, ফ্লাভিওর দেশ ছেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনও ভূমিকা ছিল কি না। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনে পরাজয় রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। ব্রাজিলে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে চলা তদন্তের মধ্যে তাঁকে আমেরিকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন: সাহসিকতার স্বীকৃতি, ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরকে সম্মান জানাল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি
সোমবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার শেষে লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৫ শতাংশ ভোট। ফ্লাভিওর ঝুলিতে পড়েছে ৪৮.২৫ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪৪ লক্ষ। এই জয়ের ফলে লুলা চতুর্থবারের জন্য ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০০২, ২০০৬ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। ফ্লাভিওর বাবা জইর বলসোনারোও ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। পরে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দায়ে তাঁর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়। সেই সময় ট্রাম্প বলসোনারো সিনিয়রের পাশে দাঁড়িয়ে লুলা প্রশাসনের সমালোচনা করেছিলেন। এবার ফ্লাভিওর আমেরিকা যাত্রা এবং তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিতর্কে ব্রাজিল-আমেরিকা সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেল।
দেখুন:




