• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 28 October, 2026

৩০০ বছর পরেও সমান জনপ্রিয়, স্কুলের ব্যাগ হোক বা বইয়ের তাক, ‘গালিভার্স ট্রাভেলস’ মাস্ট

কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও সাংস্কৃতিক বিভাগের গবেষক অরিজিৎ নন্দীর মতে, ‘সমাজ ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এই উপন্যাস। সেই  কারণে আজও এর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে‘

৩০০ বছর পরেও সমান জনপ্রিয়, স্কুলের ব্যাগ হোক বা বইয়ের তাক, ‘গালিভার্স ট্রাভেলস’ মাস্ট

Image: AI নির্মিত

৩০০ বছরে পা দিল জোনাথন সুইফটের (Jonathan Swift) কালজয়ী উপন্যাস ‘গালিবার্স ট্রাভেলস’ (Gulliver’s Travels)। আজও পাঠকের কাছে সমান আবেদন ধরে রেখেছে এই উপন্যাস (Gulliver’s Travels)। স্কুলপড়ুয়াদের ব্যাগে হামেশাই থাকে এই বই। তবে খুদেদের কাছে এই উপন্যাস যতটা জনপ্রিয় বড়দের কাছে ঠিক ততটা হয়তো নয়। ছোটদের সঙ্গে এই উপন্যাসের পরিচয় ঘটানো,  সাহিত্যের সঙ্গে যোগসূত্র করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বড়দের বিচরণ।

১৭২৬ সালে আজকের দিনে প্রকাশিত হয় এই উপন্যাস (Gulliver’s Travels)। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে লেমুয়েল গালিভার। অচেনা দেশে তাঁর পাড়ি এবং সেখানকার বিচিত্র সমাজের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে বদল ঘটে তাঁর চেনা পৃথিবীর। ছোটদের কাছে বইটির কল্পনাপ্রবণ অভিযানই বিশেষ আকর্ষণ। রাজনীতি,  ক্ষমতা এবং মানুষের আচরণ নিয়ে লেখকের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গই উপন্যাসটিকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও সাংস্কৃতিক বিভাগের গবেষক অরিজিৎ নন্দীর মতে, ‘সমাজ ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এই উপন্যাস। সেই  কারণে আজও এর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।‘

গবেষক নন্দী বলেন, ‘অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ায় সুইফট (Jonathan Swift) যখন এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন, তখন ব্যঙ্গের মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির পবিত্রতা এবং সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন। ইংরেজি সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত বিষয়গুলি হল—যুক্তি, যুক্তিবাদ এবং সংসদীয় শাসনব্যবস্থা নিয়ে সেই সময়ে কোনও লেখকের এমন সমালোচনা করার কথা ভাবাই যেত না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার বহন করে আজ যখন আমরা অতীতের দিকে ফিরে তাকাই, তখন সুইফটের সমালোচনার তীক্ষ্ণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।‘

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৬: রবীন্দ্রনাথের ‘মাল্যদান’ এবং টেস্টটিউব চিঠির গল্প

উপন্যাসর লিলিপুটের বাসিন্দাদের রাজনৈতিক বিবাদ এবং তার বিপরীতে ব্রবডিংনাগের রাজার প্রতিক্রিয়ার কথাও উল্লেখ করেন নন্দী। ইংল্যান্ডের যুদ্ধনীতি সম্পর্কে গালিভারের বর্ণনা শুনে ব্রবডিংনাগের রাজা বিস্মিত ও হতবাক হয়ে যান। গালিভারের বিভিন্ন সভ্যতার সঙ্গে পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে সুইফট দেখিয়েছেন, নিজেদের সমাজের যে অসংগতি মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারে না, অন্য সমাজের প্রেক্ষাপটে তা কতটা হাস্যকর হয়ে ওঠে।

গবেষকের মতে, বর্তমান সময়েও এই বিষয়গুলি সমান প্রাসঙ্গিক। বিশেষত, ভুয়ো তথ্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং জনমত গঠনে গণমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের যুগে সুইফটের ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে ভাবতে শেখায়।

তবে শিশুসাহিত্য হিসেবে ‘গালিভার্স ট্রাভেলস’ (Gulliver’s Travels) পরিচিতি পেয়েছিল অনেক পরে। ৩২ বছর বয়সি গবেষক অরিজিৎ নন্দী জানান, ‘অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে প্রকাশকেরা ছোটদের উপযোগী করে উপন্যাসটির সংক্ষিপ্ত ও সরল সংস্করণ প্রকাশ করতে শুরু করেন। পরে ভিক্টোরীয় যুগে বিভিন্ন সংস্করণ থেকে যৌন প্রসঙ্গ, শারীরিক রসিকতা এবং সুইফটের রাজনৈতিক ব্যঙ্গের কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয়। কারণ, সেই সময়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে ওই অংশগুলি শিশুদের জন্য অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হত। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসটি মূলত রোমাঞ্চকর অভিযানের কাহিনি হিসেবে পরিচিতি পায়, আড়ালে চলে যায় এর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের দিকটি।‘

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা, পর্ব ৫: হৈমন্তীর বাবার আজও রয়েছে টেলিপ্যাথির জোর

কলকাতার শতাব্দী প্রাচীন বইয়ের দোকান দাসগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের অরবিন্দ দাশগুপ্ত জানিয়েছেন,’ এখনও নিয়মিত বিক্রি হয় এই বইটি’। তাঁর কথায়, ‘প্রতি সপ্তাহে অন্তত চার-পাঁচটি কপি বিক্রি হয়। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়ারাই এই বইটি বেশি পড়ে। আমরাও বইটি পড়ার জন্য সবাইকে সুপারিশ করি।‘

তবে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের মধ্যে বইটির চাহিদা তুলনামূলক ভাবে কম। দাসগুপ্ত জানান, ‘অনেকেই পরিবারের ছোটদের জন্য বইটি কেনেন। যাঁরা নিজেরা বইটি পড়েছেন, তাঁরাও পরবর্তী প্রজন্মকে এই ক্লাসিক পড়তে উৎসাহিত করেন’।

কলকাতার আর এক বইয়ের দোকান ‘কথা ও কাহিনি’-র এক কর্মী জানিয়েছেন, ‘সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পড়ুয়াদের মধ্যে বইটি বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন স্কুলে আলাদা আলাদা পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয় বলে পড়ুয়ারা অনেক সময় নির্দিষ্ট স্কুলের সুপারিশ করা সংস্করণটিই খোঁজেন। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বইটি কেনার প্রবণতা কম। তাঁদের ক্ষেত্রে কলেজের পাঠ্যতালিকা বা অন্য কারণে বইটি কেনা হয়ে থাকে।‘

ওই কর্মীর কথায়, ‘বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইটের উত্থানের ফলে গালিভার্স ট্রাভেলস-এর চাহিদা ঠিক কতটা, তা নির্ধারণ করা কঠিন। তা সত্ত্বেও এত বছর পরেও মানুষ এই নির্দিষ্ট বইটি খুঁজতে আমাদের দোকানে আসেন।‘

দেখুন: