• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 28 October, 2026

অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং নদীর উপর বাঁধ

সরকারের উচিত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা, তাঁদের ভাষায় প্রকল্পের সুবিধা ও ঝুঁকি ব্যাখ্যা করা এবং বিকল্প প্রস্তাবগুলিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পুনর্বাসন, যথাযথ ক্ষতিপূরণ, জীবিকার নিশ্চয়তা এবং প্রকল্পের লাভে স্থানীয় মানুষের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং নদীর উপর বাঁধ

Photo: Statesman

অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত ১১,২০০ মেগাওয়াটের সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নয়, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পকে ঘিরে পাসিঘাটে সাম্প্রতিক হিংসা ও স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভ সরকারকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। দেশের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকার মানুষের আস্থা ও সহযোগিতা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে এত বড় প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে পারে।

সিয়াং নদী তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত। এই নদীর উজানে চিন একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করছে। তার প্রভাব ভারতের নদীপ্রবাহ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জলসম্পদের উপর পড়তে পারে। ভাটির দেশ হিসেবে ভারতের উদ্বেগ স্বাভাবিক। চিনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধও এখনও মেটেনি। অরুণাচলকে চিন নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। সীমান্তে পরিকাঠামো শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া তাই ভারতের কাছে অত্যন্ত জরুরি।

এই পরিস্থিতিতে সিয়াং প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। তবে শুধু নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে স্থানীয় মানুষের আপত্তিকে উপেক্ষা করাও বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। কারণ, প্রকল্পের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সেই এলাকার বাসিন্দাদের উপরেই। তাঁদের আশঙ্কা, বাঁধ তৈরি হলে বহু গ্রাম জলের তলায় চলে যেতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে কৃষিজমি, বসতবাড়ি, ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা। মানুষের কাছে এগুলি নিছক জমি বা সম্পত্তি নয়; এগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও পরিচয়।

বর্তমান অসন্তোষের আর একটি কারণ হল সমীক্ষার পদ্ধতি। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, সমীক্ষার কাজে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন এবং বাঁধবিরোধী আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তারের ফলে তাঁদের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। কোনও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়েই যদি মানুষ মনে করেন যে, তাঁদের কথা শোনা হচ্ছে না, তাহলে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গণতান্ত্রিক দেশে উন্নয়নের নামে মানুষের মত প্রকাশের অধিকারকে খাটো করা উচিত নয়।

মনে রাখতে হবে, সীমান্ত এলাকার মানুষ দেশের নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁদের সহযোগিতা সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার কাজকেও সহজ করে। তাঁদের আস্থা হারিয়ে কোনও সরকার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। বরং মানুষের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিলে অসন্তোষ বাড়তে পারে এবং সেই সুযোগে ভারতবিরোধী শক্তি পরিস্থিতির অপব্যবহার করতে পারে।

চিন দ্রুত পরিকাঠামো নির্মাণ করতে পারে, কারণ সেখানে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার গণতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা ভারতের মতো নয়। কিন্তু দ্রুত নির্মাণ মানেই যে সব ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত, তা নয়। পরিবেশের ক্ষতি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন এবং ভূপ্রকৃতির উপর চাপের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হতে পারে। অরুণাচলও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল। তাই এত বড় বাঁধের ক্ষেত্রে স্বাধীন পরিবেশ সমীক্ষা, দুর্যোগের ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব হিসাব অপরিহার্য।

সরকারের উচিত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা, তাঁদের ভাষায় প্রকল্পের সুবিধা ও ঝুঁকি ব্যাখ্যা করা এবং বিকল্প প্রস্তাবগুলিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পুনর্বাসন, যথাযথ ক্ষতিপূরণ, জীবিকার নিশ্চয়তা এবং প্রকল্পের লাভে স্থানীয় মানুষের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

সিয়াং প্রকল্প ভারতের কৌশলগত প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু তার সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বাঁধের উচ্চতা বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণের উপর নয়, মানুষের বিশ্বাস অর্জনের উপরেও। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না করে, স্বচ্ছতা, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং জনসম্মতির ভিত্তিতেই এগোতে হবে সরকারকে।