ভারতের রাজনীতিতে দলিত সমাজ দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কিন্তু সেই শক্তিকে সংগঠিত করে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। একদিকে পুরনো দলিত নেতৃত্বের প্রভাব কমছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জমছে ক্ষোভ, হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসওয়ানের আচরণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের অংশ হয়েও কখনও কখনও তিনি সরকারের নীতি ও কাজকর্মের সমালোচনা করছেন। তাঁর এই অবস্থানকে নিছক ব্যক্তিগত অসন্তোষ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর পিছনে রয়েছে দলিত রাজনীতির বদলে যাওয়া বাস্তবতা এবং নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখার হিসাব।
স্বাধীনতার পর থেকে দলিতদের সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই ভারতের গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ড. বি আর আম্বেদকর এই আন্দোলনের প্রধান পথপ্রদর্শক। পরবর্তী সময়ে কাঁসিরাম এবং মায়াবতীর মতো নেতারা দলিতদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু বর্তমানে সেই আন্দোলনের সামনে একাধিক সমস্যা রয়েছে। উত্তরপ্রদেশে বহুজন সমাজ পার্টির প্রভাব আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। পাঞ্জাবে দলিত জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও তাঁদের রাজনৈতিক শক্তি সব সময় ঐক্যবদ্ধ রূপ পায় না। মহারাষ্ট্রেও বিভিন্ন দলিত সংগঠন ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন রয়েছে। বিহারেও দলিত রাজনীতি মূলত বিভিন্ন দলের সঙ্গে ক্ষমতার সমঝোতার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এই রাজনৈতিক দুর্বলতার পাশাপাশি রয়েছে বেকারত্ব, অনিশ্চিত জীবিকা, শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সরকারি চাকরি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে বিলম্ব এবং চাকরির সীমিত সুযোগ তাঁদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে দলিত তরুণদের একাংশ শুধু পরিচিত রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নয়। তাঁরা বাস্তব
পরিবর্তন চান। এই প্রেক্ষাপটে অভিজিৎ দীপকের উত্থান গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের আন্দোলনের মধ্যে তাঁর পরিচিতি বেড়ে ওঠা পুরনো দলিত নেতৃত্বের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিতে পারে। তিনি নিজেকে দলিত সমাজের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করলেও তাঁর সামাজিক পরিচয় এবং আন্দোলনে তাঁর উপস্থিতি যেভাবে দেখা যাচ্ছে, তা নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার প্রশ্ন তুলেছে।
তবে কোনও আন্দোলনে একজন তরুণের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলেই তিনি দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। আন্দোলনের জনপ্রিয়তাকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হলে দরকার সুস্পষ্ট কর্মসূচি, শক্তিশালী সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ।
তবু অভিজিৎ দীপকের মতো নতুন মুখের গুরুত্ব এখানেই যে, তাঁরা প্রতিষ্ঠিত নেতাদের বাইরে থেকেও মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেন। পুরনো নেতৃত্ব যদি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে, তাহলে নতুন নেতৃত্বের জন্য জায়গা তৈরি হবেই।
চিরাগ পাসওয়ানের রাজনীতি বুঝতে গেলে তাঁর সামাজিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক অবস্থান— দুটিই বিবেচনা করতে হবে। বিহারের দুসাধ বা পাসওয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তাঁর প্রয়াত বাবা রামবিলাস পাসওয়ান দীর্ঘদিন ধরে দলিত রাজনীতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতি করেছেন। চিরাগও সেই রাজনৈতিক ধারার উত্তরাধিকারী।
কিন্তু বিজেপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। ২০২০ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনের সময় তাঁর পৃথক রাজনৈতিক অবস্থানের ফলে লোক জনশক্তি পার্টির মধ্যে ভাঙন দেখা দেয়। পরে তাঁর কাকা পশুপতি কুমার পারসের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ আলাদা হয়ে যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি আবার চিরাগকে গুরুত্ব দেয়। এর ফলে তিনি নতুন করে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি শিক্ষা দিয়েছে— ক্ষমতাসীন জোটের অংশ হওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখাও জরুরি।
তাই বিহারে অপরাধ, বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে চিরাগের সমালোচনামূলক অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি একদিকে নিজের ভোটারদের বোঝাতে চান যে, তিনি তাঁদের উদ্বেগের প্রতি সংবেদনশীল; অন্যদিকে বিজেপিকেও মনে করিয়ে দেন যে, তাঁর সমর্থনকে অবধারিত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। দলিত সমাজের মধ্যেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এই কৌশলের অংশ। কিন্তু নির্বাচনে সমর্থন পাওয়া আর মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করা এক বিষয় নয়।
যুবসমাজের কর্মসংস্থান, সরকারি নিয়োগের স্বচ্ছতা, শিক্ষার সুযোগ এবং সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলে শাসক দলের প্রতি অসন্তোষ বাড়তে পারে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়েও যদি মানুষের মনে বঞ্চনা কিংবা ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হতে পারে।
এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ এবং সরকারের বক্তব্যকে অবশ্যই তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করা দরকার। দলিত সমাজের একটি অংশের অসন্তোষকে কেবল বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়া তাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, দলিত সমাজ কোনও একক রাজনৈতিক সত্তা নয়। বিভিন্ন রাজ্য, জাতিগোষ্ঠী, শ্রেণি ও প্রজন্মের মানুষের রাজনৈতিক পছন্দ আলাদা।
উত্তরপ্রদেশে চন্দ্রশেখর আজাদের উত্থান দেখিয়েছে, পুরনো নেতৃত্বের দুর্বলতার সময় নতুন রাজনৈতিক শক্তি জায়গা করে নিতে পারে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নাগিনা কেন্দ্র থেকে তাঁর জয় সেই সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ হল, নির্বাচনী সাফল্যকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলন ও স্থায়ী সংগঠনে পরিণত করা।
অন্যদিকে চিরাগ পাসওয়ানকে একই সঙ্গে দুটি বিষয় সামলাতে হবে— কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় নিজের অবস্থান এবং নিজের সামাজিক ভিত্তির প্রত্যাশা। তিনি যদি সব সময় বিজেপির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন, তাহলে তাঁর স্বতন্ত্র পরিচয় দুর্বল হতে পারে। আবার অতিরিক্ত বিরোধিতা করলে ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে তাঁর সুবিধাও কমতে পারে। ফলে তাঁর রাজনীতিতে সমর্থন ও সমালোচনার এই ওঠানামা ভবিষ্যতেও দেখা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত দলিত রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে— কে কত বড় নেতা, তার চেয়ে বেশি— কে মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারছেন তার উপর। শুধু সামাজিক পরিচয় কিংবা নির্বাচনী সমীকরণ দিয়ে দীর্ঘদিন মানুষের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়। দরকার কর্মসংস্থান, শিক্ষার প্রসার, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সাংবিধানিক অধিকারের নিশ্চয়তা।
চিরাগ পাসওয়ানের অবস্থান তাই একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দলিত সমাজের তরুণেরা যদি নতুন নেতৃত্বের সন্ধান শুরু করে থাকেন, তাহলে পুরনো নেতাদেরও নিজেদের রাজনীতির ভাষা ও কর্মসূচি বদলাতে হবে। এই পরিবর্তনের দাবি উপেক্ষা করলে ক্ষমতার অঙ্ক সাময়িকভাবে মিলে গেলেও ভবিষ্যতের নির্বাচনী সমীকরণ অন্য রকম হয়ে উঠতে পারে।




