• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 14 October, 2026

১৫ দিন আগে দেবীর বোধন, ঐতিহ্যের টানে আজও অমলিন ভারতচন্দ্রের বাড়ির পুজো

সাধারণ প্রতিমার মতো দেবীর দু’পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতী থাকেন না। মায়ের পাশে থাকেন কার্তিক ও গণেশ। তাঁদের নীচে থাকেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। আগে হাওড়ার থলিয়া গ্রামের এক মৃৎশিল্পী প্রতিমা তৈরি করতেন।

১৫ দিন আগে দেবীর বোধন, ঐতিহ্যের টানে আজও অমলিন ভারতচন্দ্রের বাড়ির পুজো

Photo: Statesman

বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই ইতিহাস, আভিজাত্য ও পরম্পরার মেলবন্ধন। হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর ব্লকের পেঁড়ো গ্রামে কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের বংশের দুর্গাপুজোও তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস বহন করে চলেছে। ১৭১২ সালে জন্মগ্রহণকারী কবি ভারতচন্দ্র কৈশোরে ওই এলাকায় অঞ্জলি দিয়েছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। তারও আগে এলাকাটি রানী ভবশঙ্করী রায়বাঘিনীর জমিদারির অন্তর্গত ছিল। পরবর্তী সময়ে অঞ্চলটি বর্ধমান রাজপরিবারের অধীনে আসে।

এই পুজো ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। ভারতচন্দ্রের বংশধর ওঙ্কার নাথ রায় বাড়ির কনিষ্ঠ সদস্য এবং দেবোত্তর স্টেটের সভাপতি। পরিবারের আর এক বংশধর প্রিয়ঙ্কর রায়। বাড়িতে রয়েছে বিশাল ঠাকুরদালান। দেবীর নামে থাকা দেবোত্তর সম্পত্তির আয় থেকেই ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পুরো পুজোর আয়োজন করা হয়। এখানে মায়ের নামে জমি ও পুকুর রয়েছে। সেখান থেকে যা আয় হয়, তা ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রেখে পুরো পুজোর আয়োজন করা হয়।

জন্মাষ্টমী থেকে শুরু প্রস্তুতি

সম্পাদক সমীরণ চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে জন্মাষ্টমীর দিন মাটি তোলা হয়। সেই মাটি দিয়েই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। দুর্গাপুজোর প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই চলে দেবীর বোধন ও চণ্ডীপাঠ। পঞ্জিকা মেনে শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে মায়ের পুজো করা হয়। তবে এখানে কুমারীপুজোর প্রচলন নেই।

Bharatchandra Ray House Durga Puja
Photo: Statesman

প্রতিমায় বর্ধমান রাজপরিবারের ছাপ

এখানে বর্ধমান রাজপরিবারের আদলে তৈরি একচালার দুর্গাপ্রতিমা পূজিত হন। সাধারণ প্রতিমার মতো দেবীর দু’পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতী থাকেন না। মায়ের পাশে থাকেন কার্তিক ও গণেশ। তাঁদের নীচে থাকেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। আগে হাওড়ার থলিয়া গ্রামের এক মৃৎশিল্পী প্রতিমা তৈরি করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখন স্থানীয় শিল্পীরা সেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

তবে এখনও পর্যন্ত এখানে বলি প্রথা রয়েছে। মায়ের সামনে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে ছাগ বলি হয়। এর পাশাপাশি চালকুমড়ো, আখ, আদা ও গোরা লেবুও বলি দেওয়া হয়। অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে দু’টি কালো ছাগ বলি হয়। নবমীতে মোট পাঁচটি ছাগ বলি মাকে অর্পণ করা হয়।

Bharatchandra Ray House Durga Puja
Photo: Statesman

কয়েক হাজার মানুষকে ভোগ বিতরণ

ওঙ্কার নাথ রায় এই পুজোর আয়োজনের বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেন, ‘সপ্তমীতে সেবাইত-সহ পাড়ার প্রায় ২৫০-৩০০ জন মায়ের ভোগ গ্রহণ করেন। নবমীতে সেই সংখ্যাটাই পৌঁছয় প্রায় ২ হাজারের কাছাকাছি।’ এখানে মা-কে বাড়ির মেয়ের মতো যত্ন সহকারে খাওয়ানো হয়। পাঁচ রকম ভাজা, ভাত, খিচুড়ি, মাছ-মাংস, পায়েস, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও ফল-সহ নানা পদ ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। দশমীর দিন বাড়ির মেয়ে-বউরা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। ঢাক ও বিশাল শোভাযাত্রার মধ্যে দিয়ে মায়ের বিসর্জন দেওয়া হয়।

আরেক বংশধর প্রিয়ঙ্কর রায়ের কথায়, ‘ভারতচন্দ্র রায়ের বাড়িতে সারা বছরই পূজা-অর্চনা চলে। বাড়ির ভিতরে জয়দুর্গার মন্দির রয়েছে। সেখানে জয়দুর্গার পিতলের মূর্তি অধিষ্ঠিত। এছাড়াও রাধাকৃষ্ণের অষ্টধাতুর মূর্তি, ঠাকুরদালান ও শিবমন্দির রয়েছে।’

জন্মাষ্টমী থেকে শুরু করে লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো হয়ে গাজন পর্যন্ত নানা উৎসবে মেতে ওঠে গোটা বাড়ি। ইতিহাস, শাস্ত্রীয় রীতি ও সামাজিক সম্প্রীতির মেলবন্ধনে ভারতচন্দ্রের বংশের এই দুর্গাপুজো আজও বাংলার বনেদি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে।