৩৬ দিন ছিলেন গরাদের ওপারে। কারাগারের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে নাকি এমন অভিযোগ আর তার স্বপক্ষে এমন অব্যর্থ প্রমাণ ছিল যে, তাঁকে জামিন দেওয়াও নাকি কঠিন ছিল বিচারকদের পক্ষে। শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে তাঁকে জামিন দেয় স্থানীয় আদালত। ১৭ সেপ্টেম্বর জামিন পেয়ে জেল থেকে বেরিয়ে একমাসের মধ্যে মাঠে ফিরে সোমবার রঞ্জি ট্রফির প্রথম দিনই একটি ঝকঝকে সেঞ্চুরি হাঁকালেন অভিষেক পোড়েল।
শুধু অভিষেক নন, একই সঙ্গে তাঁর সঙ্গী ব্যাটার সুদীপ কুমার ঘরামিও সেঞ্চুরি হাঁকান। তাঁদের এই জোড়া সেঞ্চুরির ওপর ভর করেই বাংলার প্রথম ইনিংসে দিল্লির চেয়ে ৬৪ রান এগিয়ে রয়েছে। এখনও তাদের হাতে সাত উইকেট রয়েছে। মঙ্গলবার তৃতীয় দিনে যদি সারাটা দিন বাংলা ব্যাট করতে পারে, তা হলে যে তারা বড় লিড নিতে চলেছে, এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যে ছন্দে ব্যাট করে চলেছেন অভিষেক ও সুদীপ, তাতে তারা কোথায় গিয়ে থামবে, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সোমবার কল্যাণীতে দিল্লির বিরুদ্ধে ব্যাট করতে নেমে প্রথম দিনই অসাধারণ কাণ্ড ঘটান চন্দননগরের এই ব্যাটার-উইকেটকিপার, যা রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে। এ ভাবে একমাস জেল খেটে জামিনে বেরনোর এক মাসের মধ্যে রঞ্জি ট্রফির ম্যাচে সেঞ্চুরি—ভারতীয় ক্রিকেটে এমন ঘটনা বিরল। ঋত্বিক শোকিনের বলে এক রান নিয়ে ক্রিকেট জীবনের দ্বিতীয় প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি অভিষেক। কান্নায় ভেঙে পড়েন।
গত কয়েকটা মাস তাঁকে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে। আদালত, জেল, বন্ধ ঘরের ভিতরই বেশি কাটাতে হয়েছে তাঁকে। ক্রিকেট জীবনে নেমে এসেছিল অন্ধকার। ভবিষ্যতে আর ক্রিকেট খেলতে পারবেন কি না, ভেবে পাননি। কর্ণাটকের এক চিকিৎসক পড়ুয়া তাঁর বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ আনেন।
তাঁর অভিযোগ ছিল, অভিষেক তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস এবং ধর্ষণ করেছেন। এমনকী, তাঁর আপত্তিকর ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেলও করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মোট ন’টি ধারায় মামলা দায়ের করা হয় এবং পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে কাঠগড়ায় দাঁড় করায় এবং আদালত প্রথমে তাঁর পুলিশি হেফাজত ও পরে জেল হেফাজত হয়।
প্রায় ৩৬ দিন জেলে কাটিয়ে বাংলা দলের প্রস্তুতি শিবিরে ফেরেন তিনি এবং সোমবার দিনের শেষে যখন ১৩টি চার ও একটি ছয় হাঁকিয়ে ১৬১ বলে ১১৪ রান করে ড্রেসিংরুমে ফিরছিলেন আরেক সেঞ্চুরিয়ান সুদীপের সঙ্গে, তখন সারা মাঠ উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানান তাঁকে।
সত্যিই তিনি কোনো জঘন্য অপরাধ করেছেন কি না, সে তো তদন্তসাপেক্ষ। আদালতেই তাঁর বিচার হবে। কিন্তু যে দুঃসময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে এ দিন এই সেঞ্চুরি করেন অভিষেক, তার কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।
তবে আরেকজনের প্রশংসা করতেই হবে। তিনি সুদীপ কুমার ঘরামি। বাংলা ১০৫ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারানোর পর যখন অভিষেককে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু করেন সুদাপ, তখন লড়াইটা শুধু তাঁর একার ছিল না। অভিষেককে আলোয় ফেরানোর লড়াইও ছিল। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের দশ নম্বর সেঞ্চুরির ইনিংসটি সাজানোর পাশাপাশি সমানে অভিষেককে আগলে রেখে ও উৎসাহ জুগিয়ে গিয়েছেন তিনি।
৯৯ থেকে একশোয় পৌঁছতে অভিষেকের লেগে যায় ১৪ বল। এর মধ্যে এতটাই নার্ভাস হয়ে পড়েন অভিষেক যে, একবার রান আউট আউট হতে হতেও বেঁচে যান। বলা ভাল, তাঁকে একেবারে সঠিক কল দিয়ে বাঁচিয়ে দেন সুদীপ। এমন একজন সতীর্থের সঙ্গে পাওয়াটা অভিষেকের এই প্রত্যাবর্তনের একটা বড় কারণ বলা যেতেই পারে। সুদীপ দিনের শেষে ১২২ রানে অপরাজিত। এর মধ্যে ১৭টি বাউন্ডারি রয়েছে। কিন্তু আরো বেশি যা রয়েছে, তা হল, জীবনযুদ্ধে বিপন্ন এক সতীর্থকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়ার জন্য জোগানো সাহস।
কারাগারের অন্ধকার থেকে অবশেষে অভিষেক ফিরলেন ক্রিকেটের আলোয়। পিছনে ফেলে এসেছেন একরাশ আতঙ্কের স্মৃতি, যা জীবন থেকে মুছে ফেলতে চাইবেন যে কোনো মানুষই। এবার এই আলোর সরণি ধরে তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পালা। সামনে রঞ্জি ট্রফির আরো ম্যাচ রয়েছে। সেগুলিতেও তিনি মাথা তুলে, বুক চিতিয়ে দাঁড়ান, নিশ্চয়ই এমনই চাইবেন বাংলা ক্রিকেটপ্রেমীরা।
ভবিষ্যতে দেশের আইন তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করবে কি না, তা আদালতই জানে। কিন্তু ক্রিকেট দেবতার বিচারে যে তিনি একজন সৎ, পরিশ্রমী শিল্পী—এই রায় পেয়েই গেলেন অভিষেক পোড়েল। আপাতত এই পরিচয় নিয়েই আরো উঁচুতে উঠুন তিনি। এর পরে কী হবে, সে তো সময়ই বলবে।




