• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 10 October, 2026

২০২৭ থেকে বিমার কমিশনে লাগাম টানতে পারে আইআরডিএআই, প্রভাব পড়তে পারে ব্যাঙ্ক ও ডিজিটাল সংস্থায়

বিমা বিক্রির খরচ কমাতে এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিমার সুবিধা আরও সহজলভ্য করে তুলতে কমিশন কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তনের

২০২৭ থেকে বিমার কমিশনে লাগাম টানতে পারে আইআরডিএআই, প্রভাব পড়তে পারে ব্যাঙ্ক ও ডিজিটাল সংস্থায়

বিমা বিক্রির খরচ কমাতে এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিমার সুবিধা আরও সহজলভ্য করে তুলতে কমিশন কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ভারতের বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই। প্রস্তাবিত সংস্কারগুলি ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি অথবা ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর করার কথা বিবেচনা করছে সংস্থাটি। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমা সংস্থাগুলি ব্রোকার এবং অন্যান্য পরিবেশকদের যে কমিশন দেয়, তার ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে নিয়ন্ত্রক।

আইআরডিএআইয়ের পূর্ণ সময়ের সদস্য গিরিজা সুব্রহ্মণ্যম, যিনি বিমা বণ্টন সংক্রান্ত বিষয়গুলি দেখভাল করেন, ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকর করার জন্য দুটি সম্ভাব্য তারিখ বিবেচনা করা হচ্ছে।

জীবনবিমা, স্বাস্থ্যবিমা, সম্পত্তিবিমা-সহ বিভিন্ন ধরনের বিমার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি, বিমা সংস্থাগুলির পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বসীমাও আরও কঠোর করার প্রস্তাব রয়েছে। এই ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়া পাঁচ বছর ধরে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বিমা বণ্টনের খরচ ক্রমশ বাড়লেও দেশের বিমার আওতায় আসা মানুষের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি বলে উদ্বেগ রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার। ২০২৩ সালে বিমা বণ্টনের নিয়ম শিথিল করার পর কমিশনের পরিমাণ বিমার প্রিমিয়ামের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে বলে মনে করছে আইআরডিএআই। কিন্তু বিপণন ও বণ্টনের পিছনে অতিরিক্ত খরচ করেও বিমার আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায়নি।

কেন কমিশনে ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দিতে চাইছে আইআরডিএআই?

বিমা বিক্রির খরচ কমানো এবং সাধারণ গ্রাহকদের কাছে বিমার পলিসি আরও সাশ্রয়ী করে তোলার লক্ষ্যে গত মাসে কমিশনে ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি জীবনবিমা সংস্থাগুলির মোট প্রিমিয়ামের তুলনায় ব্যয়ের অনুপাত ২০২০-২১ অর্থবর্ষের ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ২২ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি সাধারণ বিমা সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে ২০১৯ অর্থবর্ষের ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে এই অনুপাত প্রায় ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে।

এ ছাড়াও, বিমা পরিবেশকদের মূল কমিশনের বাইরে অতিরিক্ত পুরস্কার ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও উদ্বিগ্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিছু ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত সুবিধার ফলে মূল কমিশনের তুলনায় মোট প্রাপ্তি ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

আইআরডিএআইয়ের প্রস্তাবের লক্ষ্য হল, বিমা সংস্থাগুলির খরচের উপর নিয়ন্ত্রণ আনা এবং বণ্টন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে বিমার আওতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া। একই সঙ্গে ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকায় বিমা পরিষেবা ছড়িয়ে দিতে পরিবেশকদের জন্য বিশেষ আর্থিক উৎসাহ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

বিরোধিতায় বিমা ব্রোকার, উদ্বেগ কর্মসংস্থান নিয়েও

কমিশন সংক্রান্ত প্রস্তাব ঘিরে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিমা ব্রোকার, ব্যাঙ্ক এবং ডিজিটাল বিমা পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলি। তাদের আশঙ্কা, কমিশনে কাটছাঁট হলে আয় কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়তে পারে।

বিমা ব্রোকারদের সংগঠন ‘ইনস্যুরেন্স ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া’র দাবি, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ফলে প্রায় ১০ লক্ষ কর্মসংস্থান প্রভাবিত হতে পারে। এই প্রস্তাব সংশোধনের দাবিতে সংগঠনটি এবং শিল্পক্ষেত্রের অন্যান্য প্রতিনিধিরা আইআরডিএআইয়ের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছেন।

যেসব ব্যাঙ্ক ও ডিজিটাল ব্রোকারের আয়ের বড় অংশ বিমা বণ্টনের কমিশন থেকে আসে, তাদের উপর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্লেষকদের অনুমান, কিছু উচ্চ মুনাফার ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক ও ডিজিটাল ব্রোকারদের কমিশন থেকে আয় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

প্রস্তাব প্রকাশের পর বিমা বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির শেয়ারেও চাপ পড়েছে। পলিসিবাজারের মূল সংস্থা পিবি ফিনটেকের শেয়ারের দর প্রস্তাব ঘোষণার সময় ৩৬ শতাংশ কমেছিল। অন্যদিকে, টার্টলমিন্ট ফিনটেক সলিউশনসের শেয়ারদরও তার পর থেকে প্রায় অর্ধেক হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেফরিজ ফিনানশিয়াল গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বিমা ব্যবসার ক্ষেত্রে কমিশনের হার ১০ শতাংশ কমানো হলে পিবি ফিনটেক এবং টার্টলমিন্টের মতো আর্থিক প্রযুক্তি সংস্থার মুনাফা ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

বিপুল কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা মানতে নারাজ নিয়ন্ত্রক

প্রস্তাবিত সংস্কারের ফলে ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা খারিজ করেছেন গিরিজা সুব্রহ্মণ্যম। তাঁর বক্তব্য, বিমা বণ্টনের পরিধি বাড়ানো এবং নতুন সংস্থাকে এই ব্যবসায় প্রবেশের সুযোগ করে দিলে উল্টে কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

বড় শহরের বাইরে বিমা পরিষেবা সম্প্রসারণে উৎসাহ দিতে বিশেষ সুবিধার প্রস্তাবও বিবেচনা করছে আইআরডিএআই। দশ লক্ষের কম জনসংখ্যার শহরগুলিতে বিমা বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কমিশনের ঊর্ধ্বসীমার অতিরিক্ত ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুবিধা দেওয়া হতে পারে। ৫০ হাজারের কম জনসংখ্যার এলাকায় এই অতিরিক্ত সুবিধার পরিমাণ ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

এ ছাড়া, বিমা পরিবেশক হিসেবে কাজ শুরু করার শর্ত সহজ করা এবং একই সঙ্গে অন্যান্য আর্থিক ও অ-আর্থিক পরিষেবা দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বসীমা ধাপে ধাপে কমানো হলেও কমিশনের ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কমিশন কমানোর সিদ্ধান্ত দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর করা হলে, প্রতিবার হার কমার আগে পরিবেশকেরা বেশি বিমা বিক্রির চেষ্টা করতে পারেন। এর ফলে গ্রাহকদের ভুল বুঝিয়ে বিমা বিক্রির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সুব্রহ্মণ্যমের কথায়, “যত দ্রুত সম্ভব সংস্কার কার্যকর করার পক্ষে যুক্তি রয়েছে। তবে তাড়াতাড়ি করার চেয়ে সংস্কারগুলি সঠিকভাবে কার্যকর করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

কবে থেকে কার্যকর হবে নতুন নিয়ম?

প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকর করার চূড়ান্ত তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি। এ বিষয়ে প্রকাশিত পরামর্শপত্রের উপর বিমা সংস্থা, ব্রোকার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত মতামত জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত মতামত খতিয়ে দেখার পর খসড়া বিধি প্রকাশ করবে আইআরডিএআই। সেই খসড়ার উপরও জনসাধারণের মতামত নেওয়া হবে। তার পরেই চূড়ান্ত নিয়ম বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।

পরিচালন ব্যয়ের ঊর্ধ্বসীমা কমানোর প্রস্তাবটি পাঁচ বছর ধরে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার প্রথম অন্তর্বর্তী পর্যায় নির্ধারিত হয়েছে ২০২৯ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবর্ষে।

কমিশন কাঠামোয় পরিবর্তন কার্যকর করার চূড়ান্ত সময়সীমার উপর নির্ভর করবে বিমা সংস্থা, ব্যাঙ্ক, ব্রোকার এবং ডিজিটাল পরিষেবা প্রদানকারীরা নিজেদের ব্যবসার ধরন বদলানোর জন্য কতটা সময় পাবে। একই সঙ্গে এই সংস্কার বিমার খরচ এবং সাধারণ গ্রাহকদের কাছে বিমা পরিষেবার প্রসারে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা-ও নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিধির উপর।