ভারতের বহু পরিবার মনে করেন, স্বাস্থ্যবিমা থাকলেই চিকিৎসা সংক্রান্ত আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত। নিয়মিত প্রিমিয়াম দেওয়া হচ্ছে, পলিসি সক্রিয়—তাই বড় অসুখ হলেও চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। স্বাস্থ্যবিমা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও, শুধুমাত্র তার উপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় সামাল দেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না।
কেন শুধু বিমা যথেষ্ট নয়?
চিকিৎসার খরচ দ্রুত হারে বাড়ছে। পাশাপাশি অধিকাংশ পলিসিতেই নানা শর্ত, সীমাবদ্ধতা ও ‘এক্সক্লুশন’ বা বাদ পড়া খরচ থাকে। ফলে হাসপাতালে ভর্তি বা বড় অপারেশনের সময় রোগীকে খরচের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়।
Advertisement
অ্যাটম প্রাইভ ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও হর্ষ বর্ধন-এর মতে, সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হল—‘বিমা মানেই সম্পূর্ণ সুরক্ষা।’ তাঁর কথায়, স্বাস্থ্যবিমা বড় খরচের একটি অংশ সামাল দিলেও পুরো আর্থিক চাপ মেটাতে পারে না।
Advertisement
বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে এখনও মাত্র ৩৯ থেকে ৪৮ শতাংশ পরিবারের কোনও না কোনও স্বাস্থ্যবিমা রয়েছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি পরিবার এখনও বিমার আওতার বাইরে। আবার যাঁদের বিমা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও সমস্যা কম নয়। দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ এখনও সরাসরি মানুষের পকেট থেকে যায়।
ক্লেমের সময় কোথায় সমস্যা?
অনেকেই ক্লেম করার সময় বুঝতে পারেন, সব খরচ পলিসির আওতায় পড়ে না। এর মধ্যে থাকতে পারে—
-
নির্দিষ্ট কিছু ডায়াগনস্টিক টেস্ট
-
রুম রেন্টের সীমা
-
হাসপাতাল-পরবর্তী চিকিৎসা
-
অতিরিক্ত ওষুধ ও ভিজিট চার্জ
-
কো-পে ও ডিডাক্টিবল সংক্রান্ত খরচ
এডমে ইন্স্যুওরেন্স ব্রোকারস লিমিটেড-এর এমডি নচিকেতা দীক্ষিত জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে এসব খরচ মোট বিলের ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা Insurance Regulatory and Development Authority of India-এর তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্লেম বাতিলও হয়। বড় চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে চিকিৎসা খরচ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধির হার বছরে প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ, যা সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে আজ যে ১০ লক্ষ টাকার কভারেজ যথেষ্ট মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর তা অপ্রতুল হয়ে পড়তে পারে। বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ওষুধের খরচ দ্রুত বাড়ছে।
নিয়মিত পলিসি রিভিউ না করলে এবং কভারেজ না বাড়ালে অনেকেই অজান্তেই আংশিক সুরক্ষাহীন অবস্থায় চলে যেতে পারেন।
সমাধান কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যবিমাকে ‘প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর’ হিসেবে দেখা উচিত, একমাত্র সমাধান হিসেবে নয়। বিমার অঙ্কের অন্তত ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সমপরিমাণ আলাদা সঞ্চয় রাখা আদর্শ।
উদাহরণস্বরূপ, ১০ লক্ষ টাকার পলিসি থাকলে ৪–৫ লক্ষ টাকার একটি আলাদা ‘মেডিক্যাল কনটিনজেন্সি ফান্ড’ রাখা যেতে পারে। বয়স্ক বা অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে এই তহবিল আরও বড় হওয়া প্রয়োজন।
হর্ষ বর্ধন-এর পরামর্শ, অন্তত ৬ থেকে ১২ মাসের দৈনন্দিন ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ সহজলভ্য তহবিলে রাখা উচিত। কারণ অসুস্থতার সময় আয় বন্ধ হয়ে গেলে যাতায়াত, পুনর্বাসন, বাড়িতে সুস্থ হওয়ার সময়ের খরচ—এসব বিমার আওতায় আসে না।
শেষ কথা
ভারতের বহু পরিবার এখনও স্বাস্থ্যবিমার বাইরে। তাঁদের ক্ষেত্রে বড় অসুখ মানেই বহু বছরের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। আবার যাঁদের বিমা রয়েছে, তাঁদেরও নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই।
তাই প্রকৃত আর্থিক সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন—
-
নিয়মিত পলিসি রিভিউ
-
পর্যাপ্ত কভারেজ বৃদ্ধি
-
সমান্তরাল সঞ্চয় গড়ে তোলা
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিপর্যয় আগাম জানিয়ে আসে না। তবে তার জন্য আর্থিক প্রস্তুতি নেওয়া সম্পূর্ণ মানুষের নিজের হাতেই—এটাই বিশেষজ্ঞদের মূল বার্তা।
Advertisement



