চিটফান্ড মামলায় গঠিত বিচারপতি এসপি তালুকদার কমিটির কার্যপদ্ধতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। ১২ বছর ধরে কমিটি ঠিক কী কাজ করেছে, সেই প্রশ্নই এবার সরাসরি তুলল বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ ও বিচারপতি সুদীপ দেবের ডিভিশন বেঞ্চ। আমানতকারীদের টাকা ফেরাতে এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি কেন এত ধীর, তা নিয়েও শুনানিতে একের পর এক কড়া প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় কমিটিকে।
আদালতের মূল প্রশ্ন, ১২ বছরে ১০৩টি সংস্থাকে কমিটির আওতায় আনা হলেও ওই সংস্থাগুলির অধীনে মোট কতগুলি কোম্পানি রয়েছে? বিচারপতিরা উদাহরণ দিয়ে জানান, শুধু রোজভ্যালিরই ৫৪টি কোম্পানি ছিল। ফলে কোন সংস্থার অধীনে কতগুলি কোম্পানি রয়েছে, তাদের সম্পত্তির পরিমাণ কত এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাব কী—তা চিহ্নিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ওই সংস্থাগুলির মোট সম্পত্তির পরিমাণ কত, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। বেঞ্চের আশঙ্কা, দ্রুত সম্পত্তি চিহ্নিত করে সুরক্ষিত করা না হলে সেগুলি হাতবদল বা বিক্রি হয়ে যেতে পারে। তাই সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করে তা রক্ষার ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে আদালত।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, মোট কত লক্ষ আমানতকারী রয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করেছেন? এই তথ্য সামনে এলেই আনুপাতিক হারে আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করছে আদালত।
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, কোনও প্রভাবশালী আমানতকারীর সুবিধার জন্য তারা বসেনি। ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা করে জমিয়ে রাখা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। বড় আমানতকারীরা আইনজীবী নিয়োগ করতে পারলেও সাধারণ আমানতকারীদের সেই সামর্থ্য নেই। তাঁদের স্বার্থরক্ষার দায়িত্ব আদালতের বলেই মন্তব্য বেঞ্চের।
‘সম্পত্তি গেল কোথায়?’ ডুয়ার্সের ৫৪ কোটির ঘটনায় প্রশ্ন
সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রেও কমিটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত। ডুয়ার্সে ভিবজিওর-এর প্রায় ৫৪ কোটি টাকার সম্পত্তি কমিটির আওতায় থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে তা বিক্রি হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ শুনানিতে ওঠে। অভিযোগ পাওয়ার পরেও কমিটি কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, সেই প্রশ্নও তোলে আদালত।
২৪ কর্মী, ১৩ ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, তবু গতি কোথায়?
কর্মীর অভাবের যুক্তিও মানতে নারাজ আদালত। কমিটির তরফে পর্যাপ্ত কর্মী না থাকার কথা বলা হলেও বেঞ্চের বক্তব্য, কমিটির হাতে ২৪ জন কর্মী এবং ১৩ জন তথ্য নথিভুক্তকরণ কর্মী রয়েছেন। তা সত্ত্বেও কাজের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কমিটির খরচের হিসাব নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আদালত। বেঞ্চের হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা করে খরচ হলে ১২ বছরে সরকারি অর্থের ব্যয় ১২০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। অথচ আমানতকারীদের ফেরত দেওয়া হয়েছে মাত্র প্রায় ৯৬ কোটি টাকা।
এই হিসাব সামনে রেখে বিচারপতিদের প্রশ্ন, জনগণের রাজস্ব খরচ করে যদি এমন ফলাফল হয়, তাহলে সেই খরচ কতটা যুক্তিযুক্ত? কমিটির হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত সম্পত্তি চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
আগামী ১৯ নভেম্বরের শুনানিতে কমিটিকে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ।




