দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner, CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্ক থামছেই না। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision, SIR) নিয়ে বেনজির আক্রমণের মুখে পড়েছেন তিনি। তাঁর ইস্তফার দাবিতে দেশজুড়ে গণআন্দোলনের তোড়জোড় চলছে। তার মধ্যেই নতুন করে উস্কে উঠেছে প্রায় ২০ বছর আগের এক পুরনো অধ্যায়। কেরলমে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালীন এক বিদেশি ঠিকাদারের আত্মহত্যার ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল বলে অভিযোগ। সিপিআইএম নেতা ও কেরলমের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী টি এম টমাস আইজ্যাক সম্প্রতি সেই পুরনো ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছেন। ফলে ফের উস্কে উঠেছে বিতর্ক। ঠিক কী হয়েছিল কেরলমে?
বিশদে জ্ঞানেশ
জ্ঞানেশ কুমার ১৯৮৮ ব্যাচের আইএএস (IAS) অফিসার। কেরলম ক্যাডারের এই আমলা পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব সামলেছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের যুগ্মসচিব থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব, সমবায় মন্ত্রকের সচিব, সব দায়িত্বেই তাঁর নাম রয়েছে। আইন সংশোধনের পরে নতুন নিয়মে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হওয়া প্রথম ব্যক্তি তিনি। কিন্তু নিয়োগের পর থেকে তাঁকে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই।
২০০৬ সালের সেই ঘটনা
কেরলমে বাম সরকার আসার পর ২০০৬ সালে জ্ঞানেশ কুমার ছিলেন রাজ্যের পূর্ত দপ্তরের (Public Works Department, PWD) সচিব। সে সময় বিশ্বব্যাঙ্কের (World Bank) আর্থিক সহায়তায় চলছিল কেরলম স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের (Kerala State Transport Project, KSTP) একটি বড়সড় সড়ক নির্মাণের কর্মযজ্ঞ। এই প্রকল্পে যুক্ত ছিল প্যাটি ও বিএইচএল নামে দুই মালয়েশীয় সংস্থার যৌথ উদ্যোগ পাটিবেল (Patibel)। সংস্থার তরফে কেরলমে প্রজেক্ট অফিসার ছিলেন লি বিন সিন (Lee Bin Seen)।
অভিযোগ, বকেয়া সময়ে না মেটানো, বিল আটকে রাখা-সহ এবং নানা ভাবে হেনস্থার শিকার হচ্ছিলেন লি। ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে কুয়ালা লামপুরে (Kuala Lumpur) নিজের বাসভবনে আত্মঘাতী হন তিনি। মৃত্যুর আগে যে সুইসাইড নোট (suicide note) তিনি রেখে গিয়েছিলেন, তাতে পূর্ত দপ্তরের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে হেনস্থা, ঘুষ চাওয়া এবং বিল মিটিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ ছিল বলে দাবি। সেই তালিকায় সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারের নামও ছিল বলে অভিযোগ।
এই ঘটনার জেরে ২০০৬ সালের শেষ দিকে পূর্ত দপ্তরের সচিব পদ থেকে সরানো হয় জ্ঞানেশ কুমারকে। রাজ্য সরকার এই ঘটনার জেরে ভিজিল্যান্স (Vigilance) তদন্তেরও নির্দেশ দেয়।
নতুন করে অভিযোগ
সম্প্রতি সমাজ মাধ্যমে একটি পোস্টে এই পুরনো ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে আনেন সিপিআইএম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য টমাস আইজ্যাক। তিনি জানান, লি এর সুইসাইড নোটে হেনস্থা, ঘুষের দাবি এবং বিল আটকে রাখার অভিযোগের কথা লেখা ছিল। আইজ্যাকের প্রশ্ন, এমন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সরকারের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে এলেন জ্ঞানেশ কুমার এবং শেষমেশ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের চেয়ারে বসলেন। তাঁর ইঙ্গিত, এই নিয়োগ আসলে কেন্দ্রের শাসক দলের তরফে এক ধরনের পুরস্কার।
কেন এখনই ফের চর্চায়
এমনিতেই এসআইআর (SIR) নিয়ে বিরোধীদের তোপের মুখে রয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। ভোট চুরির (vote theft) অভিযোগ তুলে দেশ জুড়ে প্রবল বিক্ষোভ শুরু হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকি তাঁকে অপসারণের জন্য ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের (impeachment) নোটিসও আনা হয়েছিল সংসদে, যদিও তা খারিজ হয়ে যায়। ফের সেই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে।ককরোচ জনতা পার্টি-সহ বিরোধীরা জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও গ্রেপ্তারির দাবি তুলেছেন। প্রাক্তন ওড়িশা মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কও তাঁর ইস্তফা চেয়েছেন। গোটা এসআইআর প্রক্রিয়া নতুন করে খতিয়ে দেখার দাবিও উঠেছে।
ঠিক এই আবহেই টমাস আইজ্যাকের এই পুরনো অভিযোগ সামনে আসায় বিতর্কের আঁচ আরও বেড়েছে।
জ্ঞানেশের প্রতিক্রিয়া
এখনও পর্যন্ত ২০০৬ সালের এই নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে জ্ঞানেশ কুমার বা নির্বাচন কমিশনের তরফে সরাসরি কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে এসআইআর সংক্রান্ত সার্বিক অভিযোগ নিয়ে আগেই সাংবাদিক বৈঠক করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন জ্ঞানেশ কুমার। বিরোধীদের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।
দু’ দশক আগের এক সুইসাইড নোট আপাতত ফের জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে। আগামী দিনে এই বিতর্ক কোন দিকে গড়ায়, সে দিকেই নজর রাখছে গোটা দেশ।




