সত্যি বা মিথ্যার তর্কে না গেলেও, সিনেমার পর্দায় ঠাকুরদালানের সেই কথোপকথনকে আমরা পর্দায় যখনই দেখি, তখন যেন আমাদের মনেও নিজেদের ছোটবেলার দাদু-ঠাকুমাদের কাছ থেকে শোনা সেই দুর্গা-অসুরের গল্পের স্মৃতি, আরও একবার নতুন করে উসকে যায়। ঘুমপাড়ানিয়া গানের পাশাপাশি, দুর্গার দশহাতে দশঅস্ত্র দিয়ে অসুরকে বধ করার কাহিনী শৈশবে সকলের কাছেই এক রোমাঞ্চকর আবেদন রেখে এসেছে। ছোটবেলায় স্পাইডারম্যান, সুপারম্যানদের সঙ্গে ঠিকঠাক করে পরিচয় ঘটে ওঠার আগে পর্যন্ত, আমাদের অনেকের কাছে এই দুর্গাই থাকে কল্পনাজগতের প্রথম সুপারহিরো বা মহিলা সুপারহিরো। তারপর শৈশব থেকে বাল্যকালে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে, দুর্গার পৌরাণিক যোগসূত্রটি একটু একটু করে পরিষ্কার হতে শুরু করে এবং আমরা বুঝি যে, তিনি একজন আরাধ্যা দেবী। আর সেখান থেকেই তখন ক্যাপ্টেন স্পার্কের মতন ছোট্ট বয়সে শোনা কল্পকাহিনীর দুর্গার ধারণাটি, ধীরে ধীরে এক বৃহত্তর চেতনার বাতাবরণে আবৃত্ত হতে শুরু করে। শেষে, পরিণত বয়সে গিয়ে দুর্গোৎসবের ধর্মীয়, পৌরাণিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং পরিশেষে জনহিতকর বা অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিকগুলি একে ওপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে, উৎসবের এক সামগ্রিক উপলব্ধি তৈরি করে।
কিন্তু তবুও মনে একটা প্রশ্ন যেন থেকেই যায়। সেটি হলো, এই যে সার্বিক চেতনা যেটির ওপর ভিত্তি করে আমরা বছর বছর উৎসব পালন করে থাকি, এটাই কি দুর্গা সম্পর্কে আমাদের একমাত্র উপলব্ধি, নাকি এর পরেও আরও কিছু কথা রয়েও যায়? পৌরাণিক বা ধার্মিক এই অস্তিত্বটি কি শুধুই চিত্তের শান্তি ও আত্মার শুদ্ধিকরণের একটি আধ্যাত্মিক মাধ্যম মাত্র, নাকি এই পৌরাণিক বিষয়টির সঙ্গে পদার্থবিদ্যার কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান এবং ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সেরও একটি কাকতালীয় যোগসুত্রও আছে?
নিউক্লিয় ফিউশন- শক্তিরূপিণী
বিগত প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সূর্যের কেন্দ্রস্থলে পারমাণবিক বিক্রিয়া অথবা নিউক্লীয় ফিউশন ঘটে চলেছে। এই বিক্রিয়ায় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ষাট কোটি মেট্রিক টন হাইড্রোজেন-প্রোটন নিজেদেরকে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত করে তৈরি করছে হিলিয়ামের নতুন পরমাণু। ফলস্বরূপ, আনুমানিক প্রায় ৩.৮৪৬x১০২০ মেগাওয়াট পরিমাণ বিশাল শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে সূর্যের অভ্যন্তরে। আর এই শক্তিই হল আমাদের দৈনিক জীবনযাপন এবং জীবনীশক্তির মূল উৎস বা আধার। এবার যদি পুরাণের সেই বহুশ্রুত আখ্যানের দিকে চোখ রাখি তাহলে দেখতে পাই যে, স্বর্গরাজ্য যখন মহিষাসুরের দাপটে মাৎস্যন্যায়ের সম্মুখীন, তখন সমগ্র দেবকুল এসে হাজির হয় ত্রিমূর্তি মানে ব্রম্ভা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের কাছে। সব শুনে এবং জ্ঞাত হয়ে এই তিন দেবতা হাইড্রোজেনের মতনই নিজেদেরকে সম্মিলিত করেন এবং সেখান থেকে জন্ম দেন হিলিয়ামের মতনই এক নতুন মৌলিক পরমাণুর, যার নাম ‘দুর্গা’। ত্রিমূর্তির দ্বারা সংঘটিত সেই ফিউশন বিক্রিয়ার ফলস্বরূপ, এই দুর্গার মধ্যে সৃষ্টি হয় এক অসীম ‘শক্তিরূপিণী’র। ব্রম্ভা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সংযোজনে সৃষ্ট দুর্গা এবং তাঁর সঙ্গে সেই প্রচণ্ড শক্তি উৎপন্ন হওয়ার গল্পটি যেন কিছুটা সহস্রাধিক বছর আগের সেই কোন এক কাল্পনিক ফিউশন বিক্রিয়ারই পৌরাণিক মডেলকথা।
ফোটোসিন্থেসিস-সর্বভূতে সংস্থিতা
পাড়ার প্রতিটি প্যান্ডেলে অষ্টমীর সকালে অঞ্জলির সময়ে উচ্চারিত, ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা’ শ্লোকটির সহজ ব্যাকরণগত অর্থ হল— দেবী আমাদের সকলের মধ্যে শক্তিরূপে বিরাজমান। শ্লোকটির আধ্যাত্মিক তাৎপর্যকে পাশে সরিয়ে যদি একটু অন্যভাবে দেখি, তাহলে দেখা যাবে যে, এর মধ্যে যেন জীববিদ্যার সেই গোড়ার কথাটি কোনোভাবে লুকিয়ে রয়েছে। উদ্ভিদজগৎ তার পত্ররন্ধ্রের ক্লোরোফিল দিয়ে সূর্যের ফোটনকণাকে শোষণ ক’রে ফোটোসিন্থেসিস বা সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে তৈরি করে শর্করা জাতীয় খাদ্য। মানুষ এবং জীবজগৎ এই শর্করা জাতীয় খাদ্যকে নিজেদের দেহে সঞ্চারণ করে জীবনীশক্তি ধারণ করে, চলন ও গমনের জন্য ক্ষমতা অর্জন করে। পারমাণবিক ফিউশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হওয়া ফোটনকণার সেই সৌরশক্তিই, সালোকসংশ্লেষে সৃষ্ট শর্করার মাধ্যমে আমাদের দেহে জৈবিক শক্তি হিসাবে জারিত হয়। তুলনামূলক দৃষ্টিতে, আপামর প্রাণীদেহে সৌরশক্তির এই সংস্থাপন বা আত্তীকরণ, যেন শক্তিরূপিণী ফোটনকনিকার ‘সর্বভূতে সংস্থিতা’ হওয়ারই একটি নিদর্শন।
থার্মোডায়নামিক্স— শক্তির ভিন্ন ভিন্ন রূপ এবং অবতার
পদার্থবিদ্যায় তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র অনুসারে শক্তির রূপপরিবর্তন ঘটে। সাদৃশ্যস্থাপন করলে এটাও দেখা যাবে যে, দুর্গার বিভিন্ন রূপের মধ্যেও যেন তাপগতিবিদ্যার বা থার্মোডিনামিক্সের কিছু কথা অন্তর্লীন হয়ে রয়েছে। দুর্গাও বহুরূপিণী। আলাদা আলাদা সেই রূপের কথা মীনাক্ষী-স্তোত্রমের মধ্যে বর্ণিতও রয়েছে। এই মীনাক্ষী-স্তোত্রমে দেবীকে যে যে রূপে বন্দনা ও বর্ণনা করা হয় সেগুলি হল— শব্দব্রম্ভময়ী (যান্ত্রিকশক্তি বা মেকানিক্যাল এনার্জি), চরাচরময়ী (তাপশক্তি বা হিট এনার্জি), জ্যোতির্ময়ী (আলোকশক্তি বা লাইট এনার্জি), বাগময়ী (শব্দশক্তি বা সাউন্ড এনার্জি), নিত্যানন্দময়ী (চৌম্বকশক্তি বা ম্যাগনেটিক এনার্জি), পরার্থপরময়ী (রাসায়নিকশক্তি বা কেমিক্যাল এনার্জি), মায়াময়ী (বৈদ্যুতিকশক্তি বা ইলেক্ট্রিক্যাল এনার্জি) এবং শ্রীময়ী (পারমাণবিকশক্তি বা অ্যাটমিক এনার্জি)। এ যেন কিছুটা তাপগতিবিদ্যার সেই প্রথম সূত্রকেই প্রকারান্তরে নির্দেশ করে। ঠিক একইভাবে এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে শক্তির নিত্যতা এবং পরিবর্তনের সূত্রটি আমরা অসুরদলনী অবয়বের মধ্যেও খুঁজে পাই। দুর্গার হাতের ধনুকটির ছিলা শরনিক্ষেপণের প্রাকমুহূর্তে যখন প্রসারিত হয়, তখন সেই ছিলার মধ্যে সঞ্চিত হয় স্থিতিস্থাপক শক্তি। এরপর ছিলাটি মুক্ত করে মহিষাসুরের দিকে যখন শরাঘাত করা হয়, তখন সেই সঞ্চিত স্থিতিশক্তি, ধাবমান বাণের মধ্যে তুল্লাঙ্ক বা ইকুইভ্যালেন্ট পরিমাণ গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। শক্তির নিত্যতা সূত্র এবং সংস্থাগত (সিস্টেমগত) রূপপরিবর্তনের নিয়মটি, এই ধনুর্ধরিণী রূপের মধ্যে সঙ্গে যেন মিলে যায়। হাতের সুদর্শন চক্রের অবস্থানটি যদি একটু গূঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় তাহলে দেখা যায় যে, চক্রটি তর্জনীকে বেষ্টন করে ঘোরে, কিন্তু অঙ্গুলীটিকে কখনোই স্পর্শ করে থাকে না। মহাকাশ বিজ্ঞানের বলবিদ্যায় দেখা যায় যে, মহাকাশে গ্রহগুলি মহাকর্ষ বলের দরুন নক্ষত্রের চারিদিকে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু কখনোই নক্ষত্রের ওপর এসে পতিত হয় না। কক্ষপথের স্পর্শক বরাবর বহির্মুখী কেন্দ্রাতিগ বল এবং সমপরিমাণ বিপরীতমুখী কেন্দ্রাভিগ বা মহাকর্ষ বল একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বমূলক ভারসাম্য বজায় রেখে গ্রহগুলিকে নক্ষত্রের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করায়। দুর্গার তর্জনী ঘিরে চক্রের ঘূর্ণন যেন কাল্পনিকভাবে মহাকাশের মহাজাগতিক বস্তুগুলির পারস্পরিক সাম্যসংস্থার একটি প্রোটোটাইপকে ইঙ্গিত করে।
ক্যাওস থিওরি— রক্তবীজ
ফলিত গণিতবিদ্যায় অনিশ্চয়তা তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগে ‘ক্যাওস থিওরি’ একটি খুবই পরিচিত নাম। বিশ্বসৃষ্টির তত্ত্ব এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মাণ্ডের স্থিতিশীলতা লাভের প্রেক্ষাপটকে বুঝতে এই ক্যাওস থিওরির একটা ভূমিকা থেকে থাকে। রক্তবীজেদের চরম অরাজকতা দ্বারা সৃষ্ট অস্থিরতার বা ক্যাওসের দরুন যখন ত্রিভুবন ত্রস্ত, তখন সেই নারকীয়তা থেকে জগতকে এক সুস্থির সাম্যের দিকে নিয়ে আসার জন্যে আবির্ভাব হয় মহাকালীর। রক্তবীজেদের বিলুপ্তি ঘটে, শান্ত হয় বিশ্বসংসার। মহাকালীর, রক্তবীজকৃত সেই অস্থির অবস্থা থেকে সাম্য প্রতিষ্ঠার উপাখ্যানটি যেন পৌরাণিক ক্যাওস থিওরির একটা সাঙ্কেতিক প্রকাশমাত্র।
আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব— অর্ধনারীশ্বর
১৯০৫ সাল। একদিকে দেশে তখন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। আর অন্যদিকে, বিশ্বের মানুষদের সামনে আইনস্টাইন প্রথমবার এসে বলছে যে— পদার্থ ও শক্তি নাকি হল একই সংস্থার অন্তর্গত দুইটি আলাদা আলাদা অস্তিত্ব। এবং শুধু তাইই নয়, তাদের একটির অপরটির সঙ্গে বিনিময় বা ইন্টারচেঞ্জ হওয়াও সম্ভব। আইনস্টাইনের এই থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটা লৌকিক বা পৌরাণিক ছবি যেন, মহামায়ার সেই অর্ধনারীশ্বর রূপের মধ্যে দিয়ে ভেসে আসে। অর্ধনারীশ্বরের দেহে আমরা একার্ধে দেখতে পাই মহাদেবকে, যিনি পুরুষ বা পদার্থকে ইঙ্গিত করেন। আবার এই একই দেহেরই অন্য অর্ধে আমরা দেখতে পাই নারীকে, যিনি শক্তিসত্তার প্রতিনিধিত্ব করেন। এইভাবে অর্ধনারীশ্বরের দেহে পদার্থ ও শক্তির সম্মিলিত সংস্থাগত অবস্থান, আইনস্টাইনের ওই আপেক্ষিকতাবাদেরই যেন একটি রূপক।
সার্বিকভাবে কাল্পনিক এবং অখণ্ড যুক্তিনির্ভর না হলেও, পদার্থবিদ্যার তত্ত্ব এবং ভারতীয় পুরাণাঙ্গের মধ্যে কোথাও যেন একটা সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়াই যায়। এই সাদৃশ্য ব্যক্তিমানসের দৃষ্টিভঙ্গিনির্ভর বা চরম বিশ্লেষণভিত্তিক বলে মনে হতেই পারে। তবুও তুলনামূলক আলোচনার নিরিখে, এইসমস্ত জাগতিক বা বৈজ্ঞানিক সত্য এবং তার পাশাপাশি এইসমস্ত পৌরাণিক লোকগাথা, মানুষের মননে যেন চিন্তনের এক আবেদন বা অবকাশ এনেই দেয়।




