• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 22 September, 2026

নারী হেনস্থা: সভ্যতার কলঙ্ক

একটি ঘটনা বিহারের জামুইয়ে। আর একটি কলকাতার একটি মাল্টিপ্লেক্সে। স্থান আলাদা, পরিস্থিতি আলাদা, অভিযুক্তদের পরিচয়ও আলাদা।

নারী হেনস্থা: সভ্যতার কলঙ্ক

প্রতীকী চিত্র

একটি ঘটনা বিহারের জামুইয়ে। আর একটি কলকাতার একটি মাল্টিপ্লেক্সে। স্থান আলাদা, পরিস্থিতি আলাদা, অভিযুক্তদের পরিচয়ও আলাদা। কিন্তু দুটি ঘটনার ভিতরে যে অন্ধকার মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা একই— নারীকে অসম্মান করা, তার নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে তুচ্ছ করা এবং দলবদ্ধতার জোরে তাকে ভয় দেখানো। সভ্য সমাজের পক্ষে এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জামুইয়ে কোচিং ক্লাসের পরে স্কুটারে বেড়াতে বেরোনো এক কিশোরী ও কিশোরকে একদল যুবকের ঘিরে ধরে হেনস্থা করার যে ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এসেছে, তা বিশেষভাবে উদ্বেগের। কিশোরীকে পিছন থেকে ধরে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা, তাকে পালাতে না দেওয়া এবং তার কাতর আবেদন উপেক্ষা করা— এই আচরণ শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়, এটি সামাজিক মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়েরও পরিচয়। বন্ধুকে রক্ষা করতে গিয়ে কিশোরটিও আক্রান্ত হয়েছে। পুলিশ ভিডিয়োর সূত্র ধরে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে— এটি অবশ্যই তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এমন সব ঘটনায় সামাজিক প্রতিরোধের শক্তি কোথায়?
কলকাতার ঘটনাটিও কম উদ্বেগজনক নয়। সিনেমা দেখতে আসা মহিলা দর্শকদের উদ্দেশে মত্ত কয়েক জন যুবকের অশালীন আচরণ, গুটখার থুতু-মেশানো জল ছুঁড়ে দেওয়া, কটূক্তি ও হুমকি— এসব কোনোভাবেই ‘দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নয়। প্রকাশ্য বিনোদনস্থলেও যদি মহিলাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে সংশয় তৈরি হয়, তবে তা নগরজীবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও প্রশ্ন তৈরি করে। দর্শকদের প্রতিবাদ এবং পুলিশের হস্তক্ষেপের পরে ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সঠিক পদক্ষেপ। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন আগে থেকে এমন আচরণ ঠেকাতে পারে না, সেটিও দেখা জরুরি।
এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয়। নারী নির্যাতনকে দলীয় রাজনীতির অস্ত্র করে তোলার মধ্যে সমস্যার সমাধান নেই। কোনও সরকারই অপরাধমুক্ত সমাজের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, কিন্তু প্রতিটি সরকারের দায়িত্ব হল অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিনোদনস্থলের পরিচালকদেরও নিজেদের দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, নারীর প্রতি সম্মান কোনও বিশেষ দিবসের প্রচারবাক্য হতে পারে না। একটি মেয়ে রাস্তায় বেরোবে, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে কোথাও যাবে, সিনেমা দেখতে যাবে— তার প্রতিটি মুহূর্তে তাকে সম্ভাব্য হেনস্থার আশঙ্কা নিয়ে চলতে হবে, এমন সমাজকে সভ্য বলা কঠিন।
আইন অনুযায়ী অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি অপরাধের সেই মানসিকতা বদলানো, যেখানে নারীকে সহজ লক্ষ্য এবং তার প্রতিবাদকে দুর্বলতা বলে মনে করা হয়। নারীকে নিরাপদ রাখতে শুধু পুলিশ নয়, গোটা সমাজকেই সক্রিয় হতে হবে। দর্শকদের সম্মিলিত প্রতিবাদ যেমন কলকাতার ঘটনায় দেখা গিয়েছে, তেমনই সর্বত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিরোধ গড়ে উঠুক।
নারী হেনস্থা কোনও বিচ্ছিন্ন ‘ঘটনা’ নয়, প্রতিটি ঘটনাই আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে এক-একটি প্রশ্নচিহ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রশাসনকে নয়, আমাদের প্রত্যেককেই দিতে হবে। কারণ সভ্য সমাজে নারীর অপমান কোনও স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না— কখনোই নয়।