• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 19 September, 2026

রুশ তেল নিয়ে ভারতের সামনে নতুন পরীক্ষা

একই সঙ্গে ভারতকে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার দরজাও খোলা রাখতে হবে। প্রস্তাবিত শুল্কের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি না ঘটিয়ে বাণিজ্য, জ্বালানি ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাগুলি খুঁজে বের করা জরুরি। তবে কোনও বাণিজ্য চুক্তি শুধু চাপ এড়ানোর জন্য করা উচিত নয়; তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রুশ তেল নিয়ে ভারতের সামনে নতুন পরীক্ষা

Photo: Magnific

রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে ভারতের উপর আমেরিকার চাপ নতুন মাত্রা পেতে চলেছে। মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিল অনুমোদিত হয়েছে। ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট ২০২৬’ নামে এই বিলে রাশিয়া বা ইরান থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।

তবে এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ বিল পাশ হওয়া এবং ভারতের উপর সঙ্গে সঙ্গে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসে যাওয়া এক কথা নয়। প্রেসিডেন্টকে প্রথমে বিলটিতে স্বাক্ষর করতে হবে। তার পরেও ভারতের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কতটা শুল্ক বসবে এবং আদৌ বসবে কি না— তা নির্ভর করবে পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর। ফলে সম্ভাব্য বিপদের গুরুত্ব বুঝেও পরিস্থিতিকে এখনই চূড়ান্ত সংকট হিসেবে দেখার কারণ নেই। কিন্তু ভারতের সামনে যে একটি কঠিন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা এসে পড়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা ভারতের কাছে নিছক বিদেশনীতি বা কূটনীতির বিষয় নয়। এটি সরাসরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন— সবই জ্বালানির দামের সঙ্গে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তায় অপরিশোধিত তেল পাওয়া গেলে তার প্রভাব অর্থনীতির বহু ক্ষেত্রেই পড়ে। গত কয়েক বছরে রাশিয়া ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। জুলাইয়ে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫১ শতাংশ রাশিয়া থেকে এসেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাশিয়ার তেল কেনার ফলে শুধু ভারতই লাভবান হয়নি, বিশ্ববাজারেও এর একটি প্রভাব পড়েছে। রাশিয়ার উপর নানা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তার বিপুল তেল আন্তর্জাতিক বাজারে কোনও না কোনও ভাবে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে সরবরাহ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। রাশিয়ার তেলকে বিশ্ববাজার থেকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। সেই মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত ভারত যেমন অনুভব করবে, তেমনই আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশও এড়াতে পারবে না।

এই বাস্তবতাই আমেরিকার জন্যও একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়লে তার রাজনৈতিক অভিঘাত পড়তে পারে। কৃষক, পরিবহন ব্যবসা এবং সাধারণ ভোক্তাদের উপর বাড়তি জ্বালানির খরচের প্রভাব পড়ে। কৃষিক্ষেত্রে ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাক্টর থেকে কম্বাইন হারভেস্টার— সবকিছুর পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়ে। আমেরিকায় নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই ধরনের অর্থনৈতিক চাপ যে সরকারের জন্য অস্বস্তিকর, তা বলাই যায়।

তাই মার্কিন কংগ্রেসের কঠোর অবস্থান থাকলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত কতটা এবং কত দ্রুত তা কার্যকর করবেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাশিয়ার উপর চাপ সৃষ্টি করা এক বিষয়, আর সেই চাপের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছনো, যাতে আমেরিকার নিজের ভোক্তারাই বিপাকে পড়েন— তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভারতের অবশ্য শুধু আমেরিকার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। সম্ভাব্য ১০০ শতাংশ শুল্ককে চূড়ান্ত ঘটনা ধরে আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ আমেরিকা ভারতের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর বড় ধরনের শুল্ক বসলে রপ্তানিকারকদের সমস্যা হতে পারে, কর্মসংস্থান ও শিল্পোৎপাদনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

এখানেই ভারতের বহুমুখী বাণিজ্যনীতির গুরুত্ব। কোনও একটি দেশের বাজারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনই কোনও একটি দেশের কাছ থেকে জ্বালানি আমদানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও বিপজ্জনক। ভারতকে তাই একই সঙ্গে দুই দিক সামলাতে হবে— রাশিয়া-সহ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানির বাজার প্রসারিত করা। জ্বালানির ক্ষেত্রেও সরবরাহের উৎস যত বেশি বৈচিত্র্যময় হবে, আকস্মিক আন্তর্জাতিক সংকটে ভারতের ঝুঁকি তত কমবে।

এই ঘটনাটি ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে আনছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের উপর চলে না; চলে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। যে দেশই হোক, নিজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। ফলে কোনও দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা মানেই ভবিষ্যতে তার সব সিদ্ধান্ত ভারতের অনুকূলে যাবে— এমন নিশ্চয়তা নেই। ভারতের বিদেশনীতি তাই কোনও একটি শক্তির উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়াই বাস্তবসম্মত।

ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যেও সেই অবস্থানের ইঙ্গিত স্পষ্ট। দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি কেনা হবে— এই নীতি বজায় রাখার কথা দিল্লি জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এই অবস্থানকে কার্যকর করতে হলে শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন বাজার খুঁজতে হবে, দেশীয় উৎপাদন ও শিল্পের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে হবে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পক্ষেত্রেও বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। কারণ আজকের বিশ্বে একটি দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনও কখনও অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

একই সঙ্গে ভারতকে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার দরজাও খোলা রাখতে হবে। প্রস্তাবিত শুল্কের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি না ঘটিয়ে বাণিজ্য, জ্বালানি ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাগুলি খুঁজে বের করা জরুরি। তবে কোনও বাণিজ্য চুক্তি শুধু চাপ এড়ানোর জন্য করা উচিত নয়; তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রুশ তেল কেনা নিয়ে বর্তমান বিরোধ তাই আসলে একটি বড় প্রশ্নের সামনে ভারতকে দাঁড় করিয়েছে: বিদেশনীতি কি অন্যের চাপ অনুযায়ী চলবে, না কি নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে? এর উত্তর শুধু রাশিয়ার তেল কেনার প্রশ্নে নয়, ভারতের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক অবস্থানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের সামনে পথ সহজ নয়। একদিকে আমেরিকার সম্ভাব্য শুল্ক, অন্যদিকে সস্তা ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজন; একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক। এই সমস্ত ভারসাম্য বজায় রেখেই এগোতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থকে কোনও তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক চাপের কাছে বিসর্জন দেওয়া যেমন বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, তেমনই সম্ভাব্য বিপদকে উপেক্ষা করাও চলবে না। ভারতের প্রয়োজন শান্ত মাথায় হিসাব করা, বিকল্প তৈরি করা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা। রুশ তেল নিয়ে বর্তমান বিতর্ক সেই আত্মনির্ভর ও বহুমুখী কৌশলের প্রয়োজনীয়তাকেই আরও স্পষ্ট করে দিল।