• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 17 September, 2026

সরকারি প্রকল্পের বাইরে মহারাষ্ট্রের বিস্মৃত মায়েদের বাস্তব ছবি

রাউতের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পায়। বম্বে হাইকোর্টের ঔরঙ্গাবাদ বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি গ্রহণ করে এবং মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চায়। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও তদন্তের নির্দেশ দেন

সরকারি প্রকল্পের বাইরে মহারাষ্ট্রের বিস্মৃত মায়েদের বাস্তব ছবি

Image: SNS

কাঠের খাটের পায়ার পাশে পড়ে ছিল একটি রেজর ব্লেডের খাপ। অতি সাধারণ একটি জিনিস। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে সেটি পড়েছিল, তা ছিল একেবারেই অসাধারণ এবং মর্মান্তিক। এর ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত নন্দুরবার জেলার এক আদিবাসী মহিলা তাঁর সদ্যোজাত সন্তানকে হারিয়েছিলেন। সাংবাদিক দীপ্তি রাউত (Dipti Raut) যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছন, তখন ওই মহিলা অচেতন অবস্থায় শুয়ে ছিলেন। মহিলার নাম গিরু কিল্লা পাওরা। বয়স ৪০ বছর। তিনিই নিজে নিজের সন্তান প্রসব করেছিলেন।

তাঁর (Dipti Raut) স্বামী মরসুমি আখ কাটার কাজে গুজরাতে চলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে তিনি বাড়িতে একটি দড়ি ও একটি ব্লেড রেখে গিয়েছিলেন। কারণ, প্রসবের সময় বাড়িতে আর কেউ না-ও থাকতে পারেন—এই আশঙ্কা তাঁর ছিল। শেষ পর্যন্ত তাই-ই হয়েছিল। প্রসববেদনা শুরু হওয়ার পর মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। শিশুটি মৃত অবস্থায় জন্মেছিল, নাকি জন্মের পর মারা গিয়েছিল—গিরু তা বলতে পারেননি।

সাংবাদিক দীপ্তি রাউতের (Dipti Raut) কাছে এই ঘটনাটি ছিল মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকাগুলিতে মাতৃস্বাস্থ্যের করুণ বাস্তবতা নিয়ে এক বছর ধরে চলা অনুসন্ধানের একটি অংশ। “আসলে পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে কাজ করেছি,” দ্য স্টেটসম্যানকে (The Statesman) বলেন রাউত (Dipti Raut)। ২০২৫ সালে মহারাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নন্দুরবারে গিয়েছিলেন। সেই সফরের খবর করতে গিয়েই এই অনুসন্ধানের সূত্র পান রাউত (Dipti Raut)। নন্দুরবার একটি সম্পূর্ণ আদিবাসী অধ্যুষিত জেলা এবং নীতি আয়োগের চিহ্নিত ‘অ্যাসপিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট’-গুলির অন্যতম। বহু বছর ধরেই এই অঞ্চলে প্রসবের সময় শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে আসছে।

রাউত (Dipti Raut) যখন এলাকার আশা কর্মী এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন এক আশা কর্মী তাঁকে জানান, বড় কোনও সমস্যা নেই। তবে তিনি এ-ও স্বীকার করেন যে এই অঞ্চলে বাঁশ ব্যবহার করে প্রসব করানো হয়। “আমি এই সূত্রটি ধরে এগোতে থাকি এবং সারা বছর ধরে বারবার সেখানে গিয়ে বিষয়টি অনুসরণ করি,” বলেন রাউত।

শেষ পর্যন্ত তাঁর অনুসন্ধান তাঁকে নিয়ে যায় ধাড়গাঁও এবং আক্কালকুয়ার বিভিন্ন গ্রামে। সেখানে এখনও প্রসবের সময় মহিলাদের সাহায্য করেন স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পুরুষ ধাত্রীরা। প্রসবের কাজে তাঁরা ব্যবহার করেন বাঁশের সরু টুকরো, তিরের ফলার মতো ধারালো জিনিস এবং রেজর ব্লেড।

মুম্বই থেকে নিজের গাড়িতে নন্দুরবারে পৌঁছেছিলেন রাউত (Dipti Raut)। সেখান থেকে স্থানীয় জিপে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। কোনও কোনও গ্রামে পৌঁছতে আবার প্রায় এক ঘণ্টা দুর্গম পথ হেঁটেছেন তিনি।

এলাকাটির দুর্গমতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল সেখানে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার প্রায় অনুপস্থিতি। “পুরো গ্রামের মানুষ আজ পর্যন্ত একটি অ্যাম্বুল্যান্সও দেখেননি,” বলেন রাউত। কোনও কোনও এলাকায় নিকটতম প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার। প্রসববেদনা ওঠা মহিলাদের বাঁশের তৈরি মাচা বা খাটিয়ায় শুইয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়।

আরও পড়ুন: ডুবে যাওয়ার আগে ভারতের দ্বীপগুলির কথা তুলে ধরছেন সাংবাদিক

রাউতের (Dipti Raut) অনুসন্ধানে উঠে আসে, স্থানীয় ভাষা পাওরিতে ‘খুভারনি’ নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী পুরুষ ধাত্রীরা এখনও সেখানে প্রসব করান। নাভির নাড়ি কাটার জন্য তাঁরা ব্যবহার করেন অত্যন্ত অপরিষ্কার ও অপর্যাপ্ত সরঞ্জাম। তাঁদের কেউ কেউ প্রসববেদনা কমানোর জন্য মহুয়া মদও ব্যবহার করেন। একটি ঘটনায় এক ধাত্রী রাউতকে জানান, একটি মৃত শিশুকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করার জন্য তিনি ব্লেড দিয়ে শিশুটির দেহ কেটে টুকরো করেছিলেন।

রাউত  (Dipti Raut) আরও জানতে পারেন, এই ধরনের মৃত্যুর অনেক ঘটনাই সরকারি নথিতে উঠে আসে না। গিরুর ক্ষেত্রেও স্থানীয় আশা কর্মী কিংবা গ্রাম পঞ্চায়েত—কেউই তাঁর প্রসব এবং সদ্যোজাত শিশুটির মৃত্যুর খবর জানতেন না। “মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবে ধরা পড়ে না,” বলেন রাউত। তাঁর (Dipti Raut) অনুসন্ধান সরকারি মাতৃকল্যাণ প্রকল্পগুলির সঙ্গে প্রত্যন্ত আদিবাসী মহিলাদের বাস্তব জীবনের মধ্যে থাকা গভীর ব্যবধানটিকে সামনে নিয়ে আসে। একদিকে রয়েছে নানা সরকারি প্রকল্প ও স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে দুর্গম পাহাড়ি গ্রামের সেইসব মহিলার জীবন, যাঁদের কাছে এখনও পৌঁছয়নি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকাঠামো।

রাউতের (Dipti Raut) এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পায়। বম্বে হাইকোর্টের ঔরঙ্গাবাদ বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি গ্রহণ করে এবং মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চায়। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও তদন্তের নির্দেশ দেন। “হাইকোর্ট সরকারকে সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজে বের করতে বলেছে,” বলেন রাউত। এই গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়স্পর্শী সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে দ্য স্টেটসম্যান (The Statesman) গর্বের সঙ্গে জানাচ্ছে—দ্য স্টেটসম্যান অ্যাওয়ার্ডস ফর রুরাল রিপোর্টিং ২০২৫-এর প্রথম পুরস্কার পাচ্ছেন দৈনিক ‘দিব্য মারাঠি’-র সাংবাদিক দীপ্তি রাউত (Dipti Raut)।