ইচ্ছা শক্তি! অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার এক অদম্য বাসনা । চোখে দেখতে পান না, কানে শুনতে পান না—এই দুই গভীর সীমাবদ্ধতা নিয়েই তিনি পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যেখানে শারীরিক অক্ষমতা কেবল এক আভরণ মাত্র । তিনি হয়ে উঠেছিলেন লেখক, বক্তা, সমাজকর্মী এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ। হেলেন কেলার, সভ্যতার ইতিহাসে হয়ে উঠেছিলেন প্রতিষ্ঠান!
১৮৮০ সালের ২৭ জুন আলাবামার টাসকাম্বিয়ায় জন্ম হেলেন অ্যাডামস কেলারের (Helen Keller)। জন্মের সময় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ শিশু। কিন্তু মাত্র উনিশ মাস বয়সে এক ভয়াবহ অসুখ তাঁর জীবনকে চিরদিনের মতো বদলে দেয়। অসুখ সেরে গেলেও চলে গেল তাঁর দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি। এত ছোট বয়সে পৃথিবীর দৃশ্য ও শব্দ—দুটিই হারিয়ে যাওয়া মানে কী, তা কল্পনা করাও কঠিন। অথচ তখনও হেলেনের ভিতরের শিশুটি ছিল কৌতূহলী, প্রাণবন্ত এবং জেদি। সে পৃথিবীকে বুঝতে চাইত, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইত। কিন্তু ভাষা ছিল তার কাছে এক অদৃশ্য দেওয়াল।
বাড়ির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য হেলেন নিজের মতো কিছু ইশারা তৈরি করেছিলেন। পরিবারের সদস্যরাও সেই ইশারার অর্থ বুঝতেন। কিন্তু এতে তাঁর মনের ভিতরের সমস্ত কথা প্রকাশ পেত না। তিনি জানতেন, তিনি কিছু বলতে চান, কিন্তু কীভাবে বলবেন তা জানতেন না। এই অসহায়তা থেকেই কখনও তাঁর মধ্যে প্রবল রাগ দেখা দিত। পরিবারের লোকেরা তাঁকে ভালোবাসতেন, কিন্তু তাঁর এই অস্থিরতার কারণ পুরোপুরি বুঝতে পারতেন না। একটি বুদ্ধিমান শিশুর মন যখন ভাষার অভাবে নিজের ভিতরেই আটকে থাকে, তার যন্ত্রণা বাইরে থেকে বোঝা সহজ নয়।
এই সময় হেলেনের (Helen Keller)জীবনে এলেন অ্যান ম্যানসফিল্ড স্যালিভান। মাত্র একুশ বছরের তরুণী শিক্ষিকা। নিজের জীবনও তাঁর খুব সহজ ছিল না। শৈশবে দারিদ্র্য, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছিলেন তিনি। পারকিন্স স্কুলে শিক্ষালাভের পর তাঁকেই হেলেনের শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়। ১৮৮৭ সালের ৩ মার্চ অ্যান স্যালিভান টাসকাম্বিয়ায় পৌঁছলেন। সেই দিনটি শুধু হেলেন কেলারের জীবনের নয়, শিক্ষার ইতিহাসেরও একটি স্মরণীয় দিন হয়ে রইল।
অ্যান বুঝেছিলেন, হেলেনের (Helen Keller) বুদ্ধির অভাব নেই। অভাব শুধু এমন একটি ভাষার, যার মাধ্যমে তিনি নিজের ভিতরের পৃথিবীকে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন। তাই তিনি হেলেনের (Helen Keller) হাতে আঙুলের সাহায্যে শব্দের বানান লিখতে শুরু করলেন। প্রথমদিকে হেলেন বুঝতে পারতেন না, এই আঙুলের নড়াচড়ার অর্থ কী। একটি জিনিস তাঁর হাতে দেওয়া হচ্ছে, আর তার সঙ্গে তাঁর তালুতে কিছু অক্ষর লেখা হচ্ছে। তিনি বিষয়টিকে অনেকটা খেলাই মনে করতেন।

তারপর এল সেই ঐতিহাসিক জলপাম্পের মুহূর্ত। অ্যান স্যালিভান এক হাতে হেলেনের হাত জলের ধারায় রাখলেন এবং অন্য হাতে তাঁর তালুতে বানান করলেন—W-A-T-E-R। “ব্ল্যাক” সিনেমায় অমিতাভ বচ্চন এবং রানী মুখার্জি যে মুহূর্তটা পুনঃনির্মাণ করেছিলেন অসাধারণ শৈল্পিক টানে | হঠাৎ যেন হেলেনের সামনে একটি দরজা খুলে গেল। তিনি বুঝলেন, তাঁর হাতে লেখা অক্ষরগুলির একটি অর্থ আছে। জল শুধু জল নয়—তার একটি নাম আছে। প্রতিটি জিনিসের একটি নাম আছে। নামের সঙ্গে জিনিসের সম্পর্ক রয়েছে। পৃথিবী হঠাৎ তাঁর কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল। মহাজাগতিক প্রতিটি বিষয় এবং বস্তুর মধ্যে এক অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে | সাধারণ দিক দর্শনে তা বোধগম্য হয় না |
এই উপলব্ধির পর হেলেন (Helen Keller) যেন থামতেই চান না। তিনি একের পর এক শব্দ জানতে চাইতে লাগলেন। জিনিস ছুঁয়ে তার নাম জানতে চাইতেন। মানুষের মুখ, গাছ, ফুল, মাটি, জল—সবকিছুর যেন নতুন পরিচয় তৈরি হতে লাগল। অ্যানের ধৈর্য এবং হেলেনের অদম্য কৌতূহল একসঙ্গে এমন একটি শিক্ষার পথ তৈরি করেছিল, যার নজির তখন পৃথিবীতে খুব বেশি ছিল না।
হেলেনের শিক্ষা কোনও সাধারণ শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা ছিল না। অ্যান তাঁকে বইয়ের পাশাপাশি প্রকৃতির কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। গাছের পাতা ছুঁয়ে হেলেন তার গঠন বুঝতেন, ফুলের গন্ধ নিয়ে চিনতেন, বাতাসের স্পর্শ অনুভব করতেন। পৃথিবী তাঁর কাছে চোখে দেখা দৃশ্যের সমষ্টি সমাহার ছিল না| ছিল স্পর্শ, গন্ধ, কম্পন ও চিন্তার এক বিশাল জগৎ।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে আবেদন, নেতাজি তদন্তে নতুন কমিশন চায় ভারত
পরবর্তীকালে পারকিন্স ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড ম্যাসাচুসেটস স্কুল ফর দ্য ব্লাইন্ডে পড়াশোনা করেন হেলেন। ব্রেইল শেখেন, পড়াশোনা করেন, লিখতে শেখেন। এরপর রাইট-হিউমাসন স্কুল ও কেমব্রিজ স্কুল ফর ইয়ং লেডিজে পড়াশোনার প্রস্তুতি নেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল কলেজে পড়া। সেই সময়ে দৃষ্টিশ্রবণ প্রতিবন্ধী একজন তরুণীর পক্ষে কলেজে যাওয়া প্রায় অকল্পনীয় ব্যাপার। কিন্তু হেলেনের কাছে ‘অসম্ভব’ শব্দটি যেন কোনও স্থায়ী অর্থ বহন করত না।
১৯০০ সালে তিনি র্যাডক্লিফ কলেজে ভর্তি হলেন। অ্যান স্যালিভান সবসময় তাঁর পাশে ছিলেন। ক্লাসের পাঠ হেলেনের হাতে বানান করে পৌঁছে দেওয়া, বই পড়ে শোনানো, নানা শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করা—সব মিলিয়ে পড়াশোনা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবু ১৯০৪ সালে তিনি র্যাডক্লিফ থেকে Bachelor of Arts ডিগ্রি লাভ করেন। দৃষ্টিশ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে তিনিই প্রথম কলেজ থেকে এই ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত বিজয় ছিল না; এটি সেই সময়ের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধেও এক শক্তিশালী উত্তর ছিল।
হেলেন কেলার (Helen Keller) লেখক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী The Story of My Life। পরবর্তীকালে তিনি আরও বহু বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর লেখায় নিজের জীবন যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে প্রকৃতি, দর্শন, সমাজ, মানুষের স্বাধীনতা এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার। তাঁর কাছে লেখা ছিল নিজের ভিতরের পৃথিবীকে অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আর-একটি পথ।
কিন্তু হেলেনের (Helen Keller) জীবনকে শুধু একজন অসাধারণ ছাত্রীর সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত শুরু হয়েছিল তখনই, যখন তিনি নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রামের বাইরে অন্য মানুষের সমস্যাকে নিজের বিষয় করে নিলেন।
তিনি বুঝেছিলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু তাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, সমস্যা দানা বেঁধে ওঠে মনে | এই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা বট গাছের মত ঝুড়ি বিস্তার করতে থাকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে। শিক্ষা নেই, কাজের সুযোগ নেই, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই—তার উপর আছে করুণার দৃষ্টি। হেলেন সেই করুণার সংস্কৃতির বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি চাইতেন প্রতিবন্ধী মানুষকে দয়া নয়, অধিকার দেওয়া হোক। তাঁদের শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে, কাজের সুযোগ দিতে হবে, নিজেদের জীবন নিজেদের মতো করে গড়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
এই ভাবনা থেকেই তাঁর দীর্ঘ সামাজিক কর্মজীবন। তিনি দৃষ্টিহীন মানুষের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর দ্য ব্লাইন্ডের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। সভা, বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার—যে কোনও সুযোগে তিনি মানুষের কাছে পৌঁছেছেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল বিশেষ ক্ষমতা প্রাপ্ত মানুষদের কথাও, যাঁদের কণ্ঠ সমাজে প্রায় শোনা যেত না।
হেলেন কেলার ছিলেন তাঁর সময়ের তুলনায় অত্যন্ত স্বাধীনচেতা নারী। নারী ভোটাধিকার, শ্রমিকের অধিকার, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়—বিভিন্ন বিষয়েও তিনি প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন। এই রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান অনেক সময় তাঁকে সমালোচনার মুখেও ফেলেছিল। কিন্তু তিনি জনপ্রিয় থাকার জন্য নিজের মত বদলাননি। তাঁর কাছে সত্যি মনে হওয়া বিষয়ের পক্ষে কথা বলাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর জীবনযাপনও ছিল প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন। তিনি সাঁতার কাটতেন, নৌকো বাওয়াতেন, ঘোড়ায় চড়তেন। শিল্পকর্মের সৌন্দর্য অনুভব করার জন্য জাদুঘর ও আর্ট-গ্যালারিতে গিয়ে ভাস্কর্য স্পর্শ করতেন। সংগীতও তিনি নিজের মতো করে অনুভব করতেন। বাদ্যযন্ত্রের কম্পন কিংবা গায়কের গলায় হাত রেখে শব্দের স্পন্দন বোঝার চেষ্টা করতেন।
এখানে হেলেনের জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখে—দেখা বলতে আমরা কী বুঝি? শোনা বলতে কী বুঝি? আমাদের চোখে যে পৃথিবী ধরা পড়ে, সেটাই কি সম্পূর্ণ পৃথিবী? হেলেন দেখিয়েছিলেন, মানুষের অনুভব করার ক্ষমতা শুধু চোখ ও কানের উপর নির্ভর করে না। স্পর্শ, গন্ধ, স্মৃতি, কল্পনা এবং চিন্তা দিয়েও পৃথিবীকে অনুভব করা যায়।
অ্যান স্যালিভান ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি হেলেনের পাশে ছিলেন। কিন্তু ১৯৩৬ সালের ২০ অক্টোবর অ্যানের মৃত্যু হেলেনের জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। যে মানুষটি তাঁকে ভাষা দিয়েছিলেন, পৃথিবী চিনিয়েছিলেন, জীবনের প্রথম বড় দরজাটি খুলে দিয়েছিলেন, তিনি আর নেই।
অ্যানের মৃত্যুর পর পলি থমসন হেলেনের জীবনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। বহু বছর ধরেই তিনি হেলেন ও অ্যানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে হেলেনের ভ্রমণ, চিঠিপত্র, কাজকর্ম এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা দায়িত্বে পলি ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহায়। ১৯৩৯ সালে হেলেন কানেকটিকাটের আরকান রিজে চলে যান। সেখানেই জীবনের শেষ দীর্ঘ অধ্যায় কাটে।

এই সময়েও তাঁর পৃথিবী ছোট হয়ে যায়নি। বরং তাঁর খ্যাতি আরও বিস্তৃত হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে তিনি প্রথম জাপান সফর করেন। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে আবার জাপানে যান। তাঁর সফর শুধু একজন বিখ্যাত ব্যক্তির বিদেশযাত্রা ছিল না। তিনি সেখানে দৃষ্টিহীন মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছিলেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। জাপানে তাঁর প্রতি মানুষের আগ্রহ ছিল বিপুল।
পরবর্তী বছরগুলিতে তিনি আরও বহু দেশ সফর করেন। পাঁচটি মহাদেশে তাঁর যাত্রা তাঁকে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। রাষ্ট্রনেতা থেকে সাধারণ মানুষ—সবার কাছে তিনি পৌঁছেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল সরল, কিন্তু গভীর। মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিবন্ধী মানুষকে সমাজের বাইরে রেখে কোনও সভ্যতা সম্পূর্ণ হতে পারে না।
কিন্তু দীর্ঘ জীবনের শেষদিকে শরীর তাঁকে ধীরে ধীরে থামিয়ে দিতে শুরু করেছিল। ১৯৬০ সালে পলি থমসনের মৃত্যু তাঁকে আরও একবার গভীরভাবে একা করে দেয়। ১৯৬১ সালে তাঁর প্রথম স্ট্রোক হয়। এরপর তিনি ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে সরে আসেন। যে নারী একসময় পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন, মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, তখন তিনি অনেকটাই নিজের ঘরের নীরবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন।
তবু তাঁর জীবন তখনও শেষ হয়ে যায়নি। কারণ একজন মানুষের জীবনের প্রভাব কখনও কখনও তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শেষ হয় না। ১৯৫৪ সালে তাঁর জন্মস্থান আইভি গ্রিন জাতীয় ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তাঁর জীবন নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র Helen Keller in Her Story ১৯৫৫ সালে অস্কার লাভ করে। ১৯৫৬ সালে উইলিয়াম গিবসনের The Miracle Worker মঞ্চে আসে এবং পরে চলচ্চিত্রেও রূপ পায়। হেলেন ও অ্যানের সম্পর্ক, জলপাম্পের সেই দৃশ্য, এক শিশুর ভাষা আবিষ্কারের গল্প—সবই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছতে থাকে।
১৯৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে Presidential Medal of Freedom প্রদান করে। জীবনের অসংখ্য সম্মানের মধ্যে এটিও ছিল অন্যতম বড় স্বীকৃতি। কিন্তু হেলেন কেলারের জীবনের আসল পুরস্কার সম্ভবত কোনও পদক ছিল না। ছিল সেই পরিবর্তন, যা তিনি মানুষের চিন্তায় আনতে পেরেছিলেন।
আরও পড়ুন: যুদ্ধের অন্ধকারে লিঙ্কন: একটি জাতির আত্মার সন্ধানে
১৯৬৮ সালের ১ জুন তাঁর জীবন শেষ হয়। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তাঁকে ওয়াশিংটন ন্যাশনাল ক্যাথিড্রালের সমাধিক্ষেত্রে অ্যান স্যালিভান ও পলি থমসনের পাশে সমাহিত করা হয়। অ্যান, যিনি তাঁকে পৃথিবীর ভাষা চিনিয়েছিলেন, এবং পলি, যিনি জীবনের শেষ দীর্ঘ পথটিতে তাঁর পাশে ছিলেন—দুই প্রিয় মানুষের পাশেই শেষ আশ্রয় পেলেন হেলেন।
হেলেন কেলারের জীবন নিয়ে ভাবলে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সেই জলপাম্পের কথা। কিন্তু তাঁর জীবনের বিস্ময় আসলে ওই একটি মুহূর্তে সীমাবদ্ধ নয়। জলকে ‘জল’ হিসেবে চিনে ফেলার পর যে শিশুটি শব্দের পিছনে পৃথিবী আবিষ্কার করেছিল, সেই শিশুই পরে বই পড়েছে, কলেজে পড়েছে, লিখেছে, বক্তৃতা দিয়েছে, পৃথিবী ঘুরেছে এবং লক্ষ লক্ষ প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে।
তাঁর জীবনে অন্ধকার ছিল। ছিল নৈঃশব্দ্য। ছিল শারীরিক দুর্বলতা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং অসংখ্য বাধা। কিন্তু তার চেয়েও শক্তিশালী ছিল জানার ইচ্ছা। ছিল মানুষের প্রতি বিশ্বাস। ছিল নিজের জীবনকে অন্য মানুষের কাজে লাগানোর আকাঙ্ক্ষা। তাই হেলেন কেলারের গল্পকে শুধু ‘অন্ধ এক নারীর সাফল্যের গল্প’ বলা অন্যায়। তিনি অন্ধত্বকে জয় করে চোখ ফিরে পাননি, শ্রবণশক্তিও ফিরে পাননি। তিনি যা করেছিলেন, তা আরও কঠিন—নিজের সীমাবদ্ধতাকে নিজের পরিচয়ের শেষ কথা হতে দেননি।
যে মানুষটি পৃথিবীকে চোখে দেখতে পাননি, তিনি পৃথিবীর বহু মানুষের চোখ খুলে দিয়েছিলেন। যে মানুষটি মানুষের কণ্ঠ শুনতে পাননি, তিনি মানুষের অধিকার নিয়ে নিজের কণ্ঠকে এত দূর পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবন তাই আজও আমাদের কাছে কেবল অনুপ্রেরণা নয়, এক গভীর মানবিক শিক্ষা।
তামসিক নিবৃত্তির প্রগলভতা সত্ত্বেও অন্ধকার সবসময় আলোকে থামাতে পারে না। কখনও কখনও আলো বাইরে থেকে আসে না—মানুষের অন্তর আত্মায় রাজসিক গুণ থেকে জন্ম নেয়। হেলেন কেলার সেই আলোকে নিজের মধ্যে জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। সমাজের সর্বস্তরে লাঞ্ছিত অবহেলিত বিশেষ ক্ষমতা প্রাপ্ত মানুষদের মধ্যে সেই মশাল আজও জ্বলছে!
দেখুন:




