আগামী শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, বৈঠকে পরমাণু শক্তি, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং বাণিজ্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জন্য রুশ সংবাদ সংস্থা স্পুটনিকের ভারতীয় শাখার আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। মস্কো এ-ও জানিয়েছে যে তারা ভারতকে রাশিয়ার অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির কিছু অংশ ব্যবহারের সুযোগ দিতে প্রস্তুত। এর মধ্যে পঞ্চম প্রজন্মের সু-৫৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়টিও রয়েছে।
এ সপ্তাহের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে সংগঠনের মূল পাঁচ সদস্য— ভারত, রাশিয়া, চিন, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার নেতাদের পাশাপাশি ব্রিকসে যোগ দেওয়া আরও কয়েকটি দেশের নেতারাও অংশ নেবেন। এই দেশগুলির মধ্যে রয়েছে ইরান, সৌদি আরব, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইথিওপিয়া।
ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে অনলাইন বৈঠকে পেসকভ বলেন, ‘আমাদের কাছে অত্যন্ত ভালো সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। তার কিছু কিছু বিশ্বের সেরা। আমরা আমাদের ভারতীয় অংশীদারদের সঙ্গে সেই প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ভাগ করে নিতে প্রস্তুত।’
মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এমন এক সময়ে পুতিনের এই ভারত সফর হচ্ছে, যখন রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার উপর আরোপিত আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দুই দেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর পথ খুঁজছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ ২০১৪ সাল থেকে চলে আসছে।
পেসকভ জানান, রাশিয়া ভারতের বাজারে নিজেদের উপস্থিতি আরও বাড়াতে চাইছে। একই সঙ্গে ভারত-রাশিয়ার রুপি-রুবল বাণিজ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে রাশিয়ার হাতে যে বিপুল পরিমাণ রুপি জমা হয়েছে, তা ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা চলছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে ভারত রেকর্ড পরিমাণ—২.৮২ বিলিয়ন ব্যারেল— অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা ওই মাসে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫৫ শতাংশ। আগস্টে সেই পরিমাণ কমে ২.০৮ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়ায়, যা ওই মাসের মোট আমদানির ৪৫ শতাংশ।
অর্থপ্রদানের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ব্রিকসের বৃহত্তর আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়া যে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে মার্কিন ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযান চালাচ্ছে— এই ব্যাখ্যা অবশ্য পেসকভ খারিজ করে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রাশিয়া শুধু এমন অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা চাইছে, যা তাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি জানান, বর্তমানে ব্রিকসের দেশগুলির সঙ্গে রাশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্যই সংশ্লিষ্ট দেশগুলির নিজস্ব মুদ্রায় সম্পন্ন হচ্ছে।
পেসকভ বলেন, ‘আমরা কোনও
ডি-ডলারাইজেশন নীতির পক্ষে নই। আমরা শুধু এমন ব্যবস্থা করছি, যা আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলি যখন ডলারের উপর নির্ভরশীল অর্থপ্রদানের বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে, ঠিক তখনই পেসকভের এই মন্তব্য সামনে এল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বারবার ব্রিকসকে সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের ভূমিকা দুর্বল করার কোনও চেষ্টা যেন না করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন দেখতে পাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে ডলারের সঙ্গে যুক্ত রাখার ফলে তাদের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই অধিকাংশ পণ্য ও বাণিজ্যিক লেনদেনের মূল্য ডলারে পরিশোধ করার প্রবণতা ক্রমশ বেড়েছে। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি তেলের দামের বড় ধাক্কার পর এই প্রবণতা আরও দ্রুত বাড়ে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র পেসকভ একই সঙ্গে ব্রিকসকে বিশ্বব্যবস্থায় আরও বড় পরিবর্তনের একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিশ্ব ক্রমশ একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যে একক আধিপত্যশীল বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার প্রভাব ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে।
মোদী-পুতিন বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে বলে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ভারত বারবার এই সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বজায় রেখেছে।
পুতিনের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মার্কিন ও রুশ কর্মকর্তারা ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাধানের পথ খুঁজতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই মাসের গোড়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি আলোচনা নতুন করে শুরু করার উদ্যোগই এই বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পেসকভ বলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে নেওয়া সমস্ত পদক্ষেপকেই মস্কো স্বাগত জানায়। এই প্রক্রিয়ায় ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকলেও রাশিয়ার আপত্তি নেই। তবে তিনি আবার রাশিয়ার পুরনো অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ভবিষ্যতে যে কোনও শান্তি চুক্তির আলোচনায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গত মাসের গোড়াতেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বিশকেকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেখানেও তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের উপর জোর দিয়েছিলেন।
পেসকভ বলেন, ‘আমরা ইউক্রেন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই এবং রাশিয়া এই প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যেতে প্রস্তুত।’
রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উপর ভারতের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও বিশ্ব বাণিজ্যের দ্রুত পরিবর্তন— এই সবকিছুর কারণে ভারতের পক্ষে ভারসাম্য বজায় রাখা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদী-পুতিন বৈঠক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সুযোগ করে দেবে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে এই বার্তাও দেওয়া যাবে যে পশ্চিমা দেশগুলির চাপ সত্ত্বেও ভারত ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্কের মূল কাঠামোতে কোনও মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।
ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং তার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে প্রভাব পড়ছে, সেটিও দুই দেশের আলোচনায় অভিন্ন উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। পেসকভ সতর্ক করে বলেছেন, পারস্য উপসাগরকে ঘিরে চলতে থাকা সংঘাত ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি করছে। তিনি হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবাধ রাখার পক্ষে রাশিয়ার সমর্থনের কথাও জানান।
তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি এবং সেখানকার পরিবেশ এখনও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ।’ তাঁর মতে, বাণিজ্যিক জাহাজ
এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলির অবাধ চলাচল
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ ভারত। তাই হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা এবং তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় ভারতীয় মুদ্রা চাপের মুখে পড়েছে এবং দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য— চাঁদ নাকি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন—সেটিও পেসকভ খারিজ করে দিয়েছেন। মহাকাশকে ব্যক্তিগত মালিকানার আওতায় আনার যে কোনও ধারণার বিরোধিতা করেছে মস্কো।




