নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর যে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; এর মধ্যে ভবিষ্যতের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তাও লুকিয়ে আছে। পাহাড়ের বরফ, পাথর, কাদা ও জল একসঙ্গে নেমে এসে মুহূর্তের মধ্যে নদীর গতিপথ ও জনজীবন তছনছ করে দিতে পারে— এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই নির্মম সত্যই আবার সামনে এল।
হিমালয়ের দুর্গম উপত্যকা বহুদিন ধরেই পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও স্থানীয় মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র। নেপালের বিভিন্ন তীর্থস্থান থেকে শুরু করে তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর— এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রতি বছর বহু মানুষ যান। কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্যে সামান্য পরিবর্তনও যে এই সুন্দর পাহাড়ি অঞ্চলকে মুহূর্তে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে পারে, সাম্প্রতিক বিপর্যয় তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে উচ্চ পাহাড় থেকে নিচের উপত্যকায় পড়লে তার অভিঘাত কতটা প্রবল হতে পারে, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট। বরফ ও পাথরের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ জল নেমে এসে নদীকে কয়েক মিনিটের মধ্যে উন্মত্ত স্রোতে পরিণত করতে পারে। নদীর জলস্তর দ্রুত কয়েক মিটার বেড়ে গেলে নিচের দিকে বসবাসকারী মানুষের হাতে পালানোর সময় থাকে না। সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাড়িঘর— সবকিছুই তখন প্রবল স্রোতের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে।
এই ধরনের বিপর্যয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল এর আকস্মিকতা। ভূমিকম্পের মতো কোনও পূর্বাভাস সবসময় পাওয়া যায় না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েও হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ঠিক কখন ভেঙে পড়বে, তা নির্ভুলভাবে বলা কঠিন। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রকৃতির এমন আকস্মিক শক্তির সামনে মানুষের প্রস্তুতি কতটা সীমিত, এই ঘটনা আমাদের তা মনে করিয়ে দেয়।
তবে এখানেই শেষ কথা নয়। হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, আর তার প্রভাব পড়ছে বরফে ঢাকা পাহাড়গুলির উপরও। হিমবাহ পিছিয়ে যাচ্ছে, বরফের পরিমাণ কমছে এবং বহু জায়গায় পাহাড়ি পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। হিমবাহ ধসের সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের বরফ ও জলভাণ্ডার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরেই হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশ নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, নির্বিচারে নির্মাণ, অতিরিক্ত পর্যটন, বনভূমি নষ্ট করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার— সব মিলিয়ে পরিবেশের উপর চাপ বাড়ছে। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু পাহাড়ের নিজস্ব প্রকৃতি ও সহনশীলতা না বুঝে উন্নয়ন হলে তা শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্যই বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এই বিপর্যয় থেকে তাই কয়েকটি শিক্ষা নেওয়া জরুরি। প্রথমত, হিমালয় অঞ্চলে বিপজ্জনক নদী ও উপত্যকাগুলির জন্য আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেখানে আকস্মিক বন্যা বা হিমবাহ-উদ্ভূত স্রোতের আশঙ্কা বেশি, সেখানে বসতি ও বড় নির্মাণ প্রকল্পের অনুমতি দেওয়ার আগে পরিবেশগত ঝুঁকি গুরুত্ব দিয়ে বিচার করতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যটন ও তীর্থযাত্রার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু রাস্তা ও হোটেল তৈরি করলেই পর্যটন উন্নত হয় না; মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশেষ করে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চিনের মধ্যে হিমালয় নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। নদী, হিমবাহ ও আবহাওয়া কোনও রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। একটি দেশের পাহাড়ে ঘটে যাওয়া বিপর্যয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্য দেশের নদী ও জনপদে আঘাত হানতে পারে। তাই তথ্য আদানপ্রদান, যৌথ গবেষণা এবং দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, হিমালয়কে শুধু পর্যটনের স্থান হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এশিয়ার জলভাণ্ডার, অসংখ্য নদীর উৎস এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত এক বিশাল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। তার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে তার প্রতিক্রিয়া একদিন না একদিন আমাদেরই বহন করতে হবে।
সাম্প্রতিক বিপর্যয় তাই কেবল শোকের কারণ নয়, আত্মসমালোচনারও সময়। নদীর তীর, পাহাড়ের ঢাল, হিমবাহের কাছাকাছি অঞ্চল— প্রতিটি জায়গাই যেন প্রকৃতির পক্ষ থেকে একটি করে সতর্কসংকেত। প্রশ্ন একটাই: আমরা কি বিপর্যয় ঘটার পর শুধু উদ্ধারকাজ করব, নাকি বিপর্যয়ের আগেই প্রকৃতির এই সতর্কবার্তা শুনে নিজেদের আচরণ বদলাব?




