মুম্বাই ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী। এই শহরের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বহুত্ব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে এসেছেন কাজের সন্ধানে, ব্যবসা করতে, পড়াশোনা করতে কিংবা নতুন জীবন গড়তে। তাঁদের ভাষা আলাদা, ধর্ম আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা। কিন্তু মুম্বাই তাঁদের সবাইকে গ্রহণ করেছে। সেই কারণেই মুম্বই শুধু একটি শহর নয়, ভারতীয় বহুত্ববাদের এক জীবন্ত উদাহরণ।
কিন্তু সম্প্রতি অটোচালক ও গাড়ির চালকদের মারাঠি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগের। স্থানীয় ভাষা শেখার গুরুত্ব নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। মহারাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষ মারাঠি শিখবেন, এই প্রত্যাশা স্বাভাবিক। ভাষা মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ায়, স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। কিন্তু একটি ভাষা শেখাকে যদি জীবিকা অর্জনের শর্ত করে তোলা হয়, তাহলে সেটি আর ভাষার প্রতি ভালোবাসা থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপ।
প্রশ্নটি তাই খুব সরল— ভারতের একজন নাগরিক কি দেশের অন্য একটি রাজ্যে গিয়ে কাজ করতে পারবেন? সংবিধান তার উত্তর স্পষ্টভাবেই দিয়েছে। ভারতের নাগরিকের দেশের যে কোনও অংশে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার এবং সেখানে বসবাস ও পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন বিহারের মানুষ মহারাষ্ট্রে কাজ করতে পারেন, একজন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কর্ণাটকে ব্যবসা করতে পারেন, একজন তামিলনাড়ুর মানুষ দিল্লিতে চাকরি করতে পারেন। এই অধিকার ভারতের একতার অন্যতম ভিত্তি।
ভারত কোনও একভাষিক দেশ নয়। এখানে বহু ভাষা, বহু উপভাষা এবং বহু ধর্মের মানুষের বসবাস। এই বৈচিত্র্য কোনও দুর্বলতা নয়, বরং ভারতের শক্তি। একটি রাজ্যের নিজস্ব ভাষার প্রতি সম্মান দেখানো যেমন জরুরি, তেমনই অন্য রাজ্য থেকে আসা মানুষের ভাষাগত পরিচয়কেও সম্মান করতে হবে। স্থানীয় ভাষার মর্যাদা রক্ষার নামে অন্য ভাষাভাষী নাগরিককে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে দেখার প্রবণতা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অটো বা ট্যাক্সিচালকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা শহরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন সরাসরি যোগাযোগ করেন। তাঁদের স্থানীয় ভাষা জানলে অবশ্যই যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়। সরকার চাইলে ভাষা শেখার প্রশিক্ষণ দিতে পারে, বিনামূল্যে ভাষা-শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে, উৎসাহ দিতে পারে। কিন্তু ভাষা না জানার কারণে কারও জীবিকা বন্ধ করে দেওয়া বা কাজের সুযোগ সংকুচিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই ভাবতে হবে।
আরও বড় কথা, মুম্বাইয়ের অর্থনীতি নিজেই বহিরাগত শ্রম ও দক্ষতার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসায়ী, চালক, কারখানার কর্মী, দোকানের কর্মচারী— অসংখ্য মানুষ দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসে এই শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখেন। তাঁদের শ্রম ছাড়া মুম্বাইয়ের স্বাভাবিক জীবন কল্পনা করা কঠিন। তাহলে তাঁদেরই যদি ভাষার পরিচয়ের ভিত্তিতে বারবার নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়, তা হলে শহরের উদার চরিত্র কোথায় থাকে?
রাজনীতির কাছে ভাষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। মাতৃভাষা ও আঞ্চলিক ভাষার সুরক্ষা যে কোনও গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক দাবি। কিন্তু ভাষাকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি বানানো বিপজ্জনক। আজ যদি বলা হয় মহারাষ্ট্রে কাজ করতে হলে মারাঠি জানতেই হবে, কাল অন্য কোনও রাজ্যে অন্য ভাষাকে একইভাবে বাধ্যতামূলক করার দাবি উঠতে পারে। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ চলাচল, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মেলবন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মুম্বাইয়ের মতো শহরের দরজা যত বেশি মানুষের জন্য খোলা থাকবে, শহর তত বেশি সমৃদ্ধ হবে। এখানে মারাঠি ভাষা তার যথাযথ মর্যাদায় থাকবে, কিন্তু সেই মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য ভাষাভাষী ভারতীয়কে হেয় করার প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ মারাঠি শিখবেন ভালোবাসা ও প্রয়োজন থেকে— ভয়ের কারণে নয়।
সরকারের দায়িত্ব নাগরিককে ভাষা শেখানো হতে পারে, কিন্তু নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সংকুচিত করা নয়। ভারতের সৌন্দর্যই হল— বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি এক দেশের মধ্যে পাশাপাশি বেঁচে থাকে। সেই বৈচিত্র্যের ভিত শক্ত করাই রাষ্ট্রের কাজ। ভাষার নামে যদি সেই বৈচিত্র্যের উপর অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করা হয়, তবে শুধু অন্য রাজ্য থেকে আসা মানুষের নয়, শেষ পর্যন্ত মুম্বাইয়েরই ক্ষতি হবে।
মুম্বাইকে তার পরিচয় বেছে নিতে হলে একটি কথাই মনে রাখা দরকার— স্থানীয় ভাষার সম্মান এবং নাগরিকের অধিকার, এই দুটিকে পরস্পরের শত্রু বানানোর কোনও প্রয়োজন নেই।




