ফাঁসির বদলে কম যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুদণ্ডের আর্জি খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। ফলে দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে প্রচলিত পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসিই বহাল থাকছে। মঙ্গলবার বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ জানিয়েছে, বর্তমানে ফাঁসির পদ্ধতি বদলানোর মতো যথেষ্ট আইনি বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আদালতের সামনে নেই। তবে ভবিষ্যতে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা চিকিৎসাবিজ্ঞান সমর্থিত প্রমাণ সামনে আসলে বিষয়টি নিয়ে ফের পর্যালোচনার পথ খোলা রেখেছে শীর্ষ আদালত।
ফাঁসির বদলে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন, গুলি, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা বা অন্য কোনও কম যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন আইনজীবী ঋষি মালহোত্রা। তাঁর আবেদন ছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির শাস্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রেও যেন ন্যূনতম শারীরিক যন্ত্রণা এবং সর্বাধিক মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়। মামলায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫৪(৫) ধারার সাংবিধানিক বৈধতাকেও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। ওই ধারায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ‘মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁস’ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
মামলাকারীর আইনজীবীর যুক্তি ছিল, ফাঁসির ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ হতে পারে। তাছাড়া দণ্ডিত ব্যক্তিকে শারীরিক যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয়। আদালতে সওয়াল করা হয়, ফাঁসির পর কোনও কোনও ক্ষেত্রে মৃত্যু নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তার বদলে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন প্রয়োগ বা গুলির মতো পদ্ধতিতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যু নিশ্চিত করা সম্ভব। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব কম শারীরিক কষ্ট নিশ্চিত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে গৃহীত নীতির কথাও আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়।
মামলাকারীর আরও দাবি, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে জীবনের অধিকারের পাশাপাশি মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুবরণের বিষয়টিও যুক্ত। সেই যুক্তিতে ফাঁসিকে নিষ্ঠুর ও অমানবিক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানানো হয়। এর পাশাপাশি এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের তিনটি রায় পুনর্বিবেচনা করে মামলাটি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর আবেদনও করা হয়েছিল।
কিন্তু বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ সেই আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে। আদালতের মতে, আগের রায়গুলি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি দেখাতে পারেননি মামলাকারী। ফলে দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোয় ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধান আপাতত অপরিবর্তিতই থাকছে।
তবে এখানেই সম্ভাবনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি শীর্ষ আদালত। বিচারপতিদের বক্তব্য, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিকল্প কোনও পদ্ধতি, যা ফাঁসির তুলনায় কম যন্ত্রণাদায়ক। তার পক্ষে ভবিষ্যতে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাবিজ্ঞান সমর্থিত বা ব্যবহারিক তথ্যপ্রমাণ সামনে এলে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে বিকল্প পদ্ধতিগুলি নিয়ে বিস্তারিত সমীক্ষাও করতে পারে বলে জানিয়েছে আদালত।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে এর আগেও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালে মামলাটির শুনানির সময় ফাঁসির ফলে ঠিক কতটা শারীরিক যন্ত্রণা হয়, মৃত্যু হতে কতটা সময় লাগে এবং ফাঁসি কার্যকর করার বাস্তব পরিস্থিতি কী সব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল আদালত। পরবর্তী পর্যায়ে বিকল্প পদ্ধতি খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের সম্ভাবনাও সামনে আসে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুনানির সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সামনে ফাঁসি এবং প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের মতো দু’টি বিকল্প রাখার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়, এই ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর করা যথেষ্ট জটিল।
বিদেশে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের ব্যবহার এবং তার বাস্তব অভিজ্ঞতাও আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্র মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়ে আগ্রহী নয় বলেই অবস্থান স্পষ্ট করে। অর্থাৎ, আপাতত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসিই বহাল থাকছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের অবসান হচ্ছে না। বরং আদালত যেভাবে ভবিষ্যতে নতুন বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা রেখে দিয়েছে, তাতে এই প্রশ্নটি আগামী দিনে ফের শীর্ষ আদালতের সামনে উঠতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সামনে এলে বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে ফের ভাবার সুযোগও রেখে দিল শীর্ষ আদালত।




