• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 17 August, 2026

যুবশক্তি ও আত্মনির্ভরতার পথে ভারত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-র ক্ষেত্রে এক কোটি যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও সময়োপযোগী। আগামী দিনের অর্থনীতি শুধু প্রচলিত চাকরির উপর নির্ভর করবে না। এআই, রোবোটিক্স, ডেটা সেন্টার, মহাকাশ প্রযুক্তি, ড্রোন, বৈদ্যুতিক যান, বায়ো-ইকোনমি— নতুন নতুন ক্ষেত্র কর্মসংস্থানের দরজা খুলছে

যুবশক্তি ও আত্মনির্ভরতার পথে ভারত

Image: ANI

স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে লালকেল্লার প্রাচীর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ নিছক সরকারের সাফল্যের খতিয়ান নয়, বরং আগামী ভারতের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনার দিশা। এবারের ভাষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দেশের যুবসমাজ। এর তাৎপর্য যথেষ্ট গভীর। কারণ, যে ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে, সেই ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ প্রজন্ম।

দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে যুবকদের উদ্বেগও অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানোর প্রয়োজন— সব মিলিয়ে তরুণদের সামনে যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনই রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে বিনামূল্যে অনলাইন কোচিংয়ের বিস্তৃত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু তরুণ অর্থের অভাবে ভালো প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হন। অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে সেই বাধা অনেকটাই দূর করা সম্ভব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-র ক্ষেত্রে এক কোটি যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও সময়োপযোগী। আগামী দিনের অর্থনীতি শুধু প্রচলিত চাকরির উপর নির্ভর করবে না। এআই, রোবোটিক্স, ডেটা সেন্টার, মহাকাশ প্রযুক্তি, ড্রোন, বৈদ্যুতিক যান, বায়ো-ইকোনমি— নতুন নতুন ক্ষেত্র কর্মসংস্থানের দরজা খুলছে। ভারতের তরুণরা যদি এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারে, তবে জনসংখ্যার বিশাল শক্তি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।

খেলাধুলার ক্ষেত্রেও ২০৩৬ সালের অলিম্পিককে সামনে রেখে প্রতিভা খোঁজার উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও স্কুলগুলিতে ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সি প্রতিভাবানদের খুঁজে বের করার পরিকল্পনা দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিভার অভাব নেই; প্রয়োজন শুধু সঠিক প্রশিক্ষণ, পরিকাঠামো এবং সুযোগের।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আত্মনির্ভরতার সঙ্গে বিশ্ববাজারে প্রবেশের বার্তা। আত্মনির্ভর ভারত মানে বিশ্বের দরজা বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং দেশের উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠাই এর লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভারতের তৈরি পণ্যকে শুধু দেশের বাজারে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে হবে। গুণমান এবং দাম—দুই ক্ষেত্রেই বিশ্বের সেরা পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে।

এই লক্ষ্যেই ‘শক্তির সপ্তধারা’র কথা বলা হয়েছে— উৎপাদন, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, যোগাযোগ ও লজিস্টিকস, প্রতিরক্ষা, সবুজ ও নীল অর্থনীতি এবং ভারতের সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শক্তি। এই সাতটি ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে অর্থনীতির ভিত আরও শক্তিশালী হবে। কৃষক শুধু উৎপাদক থাকবেন না, তিনি বিশ্ববাজারের সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই আত্মনির্ভরতার ধারণার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। জ্বালানি, সার, ওষুধ, প্রযুক্তি বা সেমিকন্ডাক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদকে কোনও দেশ রাজনৈতিক বা কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে তার প্রভাব সারা বিশ্বের উপর পড়ে। তাই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা গড়ে তোলা ভারতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও জরুরি। একই সঙ্গে রপ্তানি বাড়ানোও প্রয়োজন, যাতে আত্মনির্ভরতা আত্মকেন্দ্রিকতার নাম না হয়।

সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির মতো ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া ভবিষ্যতের ভারত গঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রযুক্তির যুগে শুধু বড় বাজার হওয়া যথেষ্ট নয়; ভারতকে উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে হবে। ৬জি, এআই, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রসঙ্গটিও গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের দ্রুত বাস্তবায়ন হলে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। দেশের উন্নয়নে মহিলাদের অংশগ্রহণ যত বাড়বে, ততই উন্নয়নের সুফল সমাজের বিস্তৃত অংশে পৌঁছবে।এবারের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণের সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা হলো, ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাস।

উন্নত ভারত গড়ার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; শিল্পপতি, কৃষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, যুবক-যুবতী এবং সাধারণ নাগরিক— সবার। সংস্কার শুধু সরকারের নীতিতে নয়, সমাজের চিন্তাভাবনা ও কাজের পদ্ধতিতেও প্রয়োজন। এই সম্মিলিত প্রয়াসই ভারতকে ২০৪৭-এর লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। এই লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। ভারতের সম্ভাবনা বিপুল— এখন সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সময়।