• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 16 August, 2026

‘আমি দুর্নীতি করিনি’, দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার প্রাক্তন মন্ত্রী-ডেপুটি স্পিকারের ঝুলন্ত দেহ, মিলল সুইসাইড নোট

ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কখনও টাকা নেননি। অর্থের বিনিময়ে কাউকে কোনও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেননি, চিঠিতে এমনই সব দাবি করেছেন তিনি। চাকরি বা আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না বলে লেখা রয়েছে। সেই চিঠিতে তিনি পরিবারের উদ্দেশেও বার্তা দিয়ে গিয়েছেন।

‘আমি দুর্নীতি করিনি’, দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার প্রাক্তন মন্ত্রী-ডেপুটি স্পিকারের ঝুলন্ত দেহ, মিলল সুইসাইড নোট

Photo: Statesman

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ভার কি আর বইতে পারলেন না? ‘আমি দুর্নীতি করিনি’—শেষ চিঠির পাতায় নিজের নির্দোষের কথা লিখে গেলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার তথা বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। বাড়ি লাগোয়া দলীয় কার্যালয় থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে। ঘটনার পর রামপুরহাটে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে একটি সুইসাইড নোট। সেই নোটের বিষয়বস্তু ঘিরেই একাধিক প্রশ্ন দানা বাঁধতে শুরু করেছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বীরভূমের তৃণমূল সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন আশিস। রামপুরহাট থেকে দু’বার বিধায়ক হয়েছেন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রীসভার সদস্যও হন। বিধানসভার ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্বও সামলেছেন। পাশাপাশি তারাপীঠ উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন রামপুরহাট কলেজে অধ্যাপনা করার সুবাদে এলাকায় তাঁর পরিচিতি ছিল ‘মাস্টারমশাই’ হিসেবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে করে। বিশেষ করে তারাপীঠ উন্নয়ন পর্ষদে বিপুল অর্থের অনিয়মের অভিযোগ তোলে বিজেপি। রামপুরহাট পুরসভা নিয়েও ওঠে নানা প্রশ্ন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজয়ের পর ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন আশিস। পরে দলের চেয়ারম্যানের পদও ছেড়ে দেন।

সেই অভিযোগই যে তাঁকে গভীর ভাবে আঘাত করেছিল, তার ইঙ্গিত মিলেছে উদ্ধার হওয়া চিঠিতে। চিঠিটির উপরে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম, রামপুরহাট কলেজের প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তাঁর পরিচয় এবং রামপুরহাটের ঠিকানা লেখা রয়েছে। চিঠির ভিতরে আশিস লিখেছেন, তারাপীঠ উন্নয়ন পর্ষদে তাঁর কোনও আর্থিক ক্ষমতা ছিল না। জেনারেল মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা ছাড়া কোনও পরিকল্পনা পাশ করা বা চেকে সই করার ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। ফলে দুর্নীতির সঙ্গে তাঁর যোগ থাকার অভিযোগ সত্য নয়, এমনটাই দাবি করেছেন তিনি।

শুধু রাজনৈতিক জীবন নয়, চিঠিতে উঠে এসেছে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকজীবনের কথাও। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কখনও টাকা নেননি। অর্থের বিনিময়ে কাউকে কোনও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেননি, চিঠিতে এমনই সব দাবি করেছেন তিনি। চাকরি বা আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না বলে লেখা রয়েছে। সেই চিঠিতে তিনি পরিবারের উদ্দেশেও বার্তা দিয়ে গিয়েছেন। রাজনীতিতে আসাকে নিজের ‘ভুল’ বলে উল্লেখ করে পরিবারের কাউকে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে না আসার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক অটুট রাখার কথাও লিখেছেন। সবশেষে তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন, এমন কথাও রয়েছে চিঠিতে। তবে চিঠিটি আদৌ তাঁর লেখা কি না এবং এর সঙ্গে মৃত্যুর কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ। পেশায় তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। রাজনীতিতেও বরাবর তুলনামূলক ভাবে সংযত এবং মৃদুভাষী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ২০২২ সালে বীরভূমের বগটুই-কাণ্ডের পর তৃণমূলের অন্দরের টানাপড়েন নিয়েও তাঁর নাম আলোচনায় এসেছিল। এক সময় বীরভূমের সংগঠন সামলানোর অন্যতম মুখ ছিলেন আশিস। অনুব্রত মণ্ডল জেলে যাওয়ার পর জেলার সংগঠন ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর এমন আকস্মিক এবং মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না পরিচিতরা।

আরও পড়ুন: বাড়ি দখল-তোলাবাজির অভিযোগ, গ্রেপ্তার হাওড়ার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা, ছোঁড়া হল ডিম

দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক পরাজয় এবং ক্রমশ সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া সব মিলিয়ে শেষ কয়েক মাসে আশিসের মানসিক অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছিল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। উদ্ধার হওয়া চিঠির বক্তব্যও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তাঁর মৃত্যু ঘিরে স্বাভাবিক ভাবেই তৈরি হয়েছে রহস্য। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে।