• facebook
  • twitter
Thursday, 8 January, 2026

‘বিজেপিকে রাজ্য থেকে আনম্যাপ করতেই হবে’, ডাক অভিষেকের

হেলিকপ্টারেই দুপুর দুটোর পরে বীরভূমের উদ্দেশে রওনা দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দু’ঘণ্টা পরে তিনি রামপুরহাটে পৌঁছন।

নিজস্ব চিত্র

প্রচারের একেবারে সূচনালগ্নেই বাধার মুখে পড়লেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার বীরভূমের রামপুরহাটে জনসভায় যোগ দিতে নির্ধারিত সময়েই তিনি বেহালা ফ্লাইং ক্লাবে পৌঁছে গিয়েছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সকাল এগারোটায় তাঁর হেলিকপ্টার ওড়ার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই অনুমতি দেয়নি অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। দুপুর গড়িয়ে গেলেও হেলিকপ্টার ওড়ার ছাড়পত্র না মেলায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে, কথা কাটাকাটি ও তর্কাতর্কির খবরও পাওয়া যায়।

তৃণমূলের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সময়মতো বীরভূমে পৌঁছতে দেওয়া হয়নি। দলের দাবি, ঘাসফুল শিবিরের প্রচারে ভয় পেয়েই বিজেপি চক্রান্ত শুরু করেছে এবং তার অংশ হিসেবেই অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপর প্রভাব খাটিয়ে এই বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বিকল্প পথ খোঁজা হয়। সকাল থেকে নিজের হেলিকপ্টার ওড়ার অনুমতি না মেলায় ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর হেলিকপ্টার ভাড়া করা হয়। সেই হেলিকপ্টারেই দুপুর দুটোর পরে বীরভূমের উদ্দেশে রওনা দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দু’ঘণ্টা পরে তিনি রামপুরহাটে পৌঁছন।

Advertisement

বিলম্ব হলেও কর্মসূচি বাতিল করেননি তিনি। রামপুরহাটের তিলাই ময়দানের জনসভায় পৌঁছেই প্রথমেই হেলিকপ্টার ইস্যুতে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। অভিষেক বলেন, এখনো রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি, কিন্তু তার আগেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘আমার হেলিকপ্টারের যে অনুমতি সকাল এগারোটায় দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়া হয়নি।

Advertisement

আমি গাড়িতে আসার কথাও ভেবেছিলাম। পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা। কিন্তু আমি জেদ ছাড়িনি। পাশের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে হেলিকপ্টার আনালাম। দু’ঘণ্টা দেরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমি কথা রেখেছি। যত দেরিই হোক, আমি সভায় যাবই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধমকানি, চমকানি, ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত করে আমাদের আটকানো যাবে না। আমি কোনও ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করি না। ওদের যা জেদ, আমার তার দশ গুণ জেদ। যতই হামলা করুক, আবার জিতবে বাংলা।’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় উপস্থিত ছিলো মুখ্যমন্ত্রী তৈরি করে দেওয়া কোর কমিটির সদস্যরা যার মধ্যে রয়েছেন সাংসদ শতাব্দী রায়, বিধানসভার সহ-অধ্যক্ষ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা, অনুব্রত মণ্ডল, কাজল শেখ, সামিরুল ইসলাম সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ।

এরপর বক্তব্যে উঠে আসে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ও এসআইআর প্রসঙ্গ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আসার পথে শুনলাম নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনকেও শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছে। টলিউডের উজ্জ্বল নক্ষত্র, সাংসদ দেবকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করা ক্রিকেটার মহম্মদ শামিকেও নোটিস দেওয়া হয়েছে। এগুলো কি ষড়যন্ত্র নয়?’ তাঁর স্পষ্ট বার্তা, যারা এই কাজ করছে, তাদের উপযুক্ত জবাব দিতে হবে ভোটের মাধ্যমে।

যদিও নির্বাচন কমিশন অভিষেকের এই অভিযোগের জবাব দিয়েছে মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অমর্ত্য সেনকে শুনানির জন্য কোনও নোটিস পাঠানো হয়নি।

বীরভূমের সভা থেকেই বিজেপির বিরুদ্ধে আরও তীব্র আক্রমণ শানান অভিষেক। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের মানুষের প্রাপ্য টাকা আটকে রেখেছে। একশো দিনের কাজের টাকা বন্ধ, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বঞ্চনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষ আর অপেক্ষা করে বসে থাকবে না।’

বিজেপি ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষ ভাতে মার খাবে বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর দাবি, তৃণমূল জিতলে মানুষ দু’মুঠো ভাত পাবে, আর বিজেপি জিতলে মানুষের জীবন আরও সংকটের মুখে পড়বে। মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব তুলে ধরে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দেন অভিষেক। তিনি বলেন, যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন, ততদিন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার চালু থাকবে। মাসের প্রথমে যেভাবে টাকা পাচ্ছেন, সেভাবেই পাবেন। বিজেপি যতই চেষ্টা করুক, এই প্রকল্প বন্ধ করতে পারবে না। বিজেপি নেতাদের মহিলাদের ঘরবন্দি করার মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, এই মানসিকতার জবাব দিতে হবে নির্বাচনে।

রাজনৈতিক লক্ষ্যও স্পষ্ট করে দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তাঁর ঘোষণা, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে আড়াইশোর বেশি আসন পাবে। বীরভূমে এগারোটি আসনের মধ্যে এগারোটিতেই জয়ের লক্ষ্য বেঁধে দিয়ে তিনি বলেন, আলিপুরদুয়ারে যেমন পাঁচে পাঁচ হয়েছে, তেমনই বীরভূমে এগারো শূন্য করতে হবে। প্রতিটি বুথে লিড বাড়ানোর নির্দেশও দেন তিনি। বিজেপিকে রাজ্য থেকে পুরোপুরি মানচিত্র-ছাড়া করার ডাক দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক ভাষণের পর সভা শেষ করে মানবিক কর্মসূচিতেও অংশ নেন তিনি। রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে সদ্য মা হওয়া সোনালি বিবির সঙ্গে দেখা করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রসূতি বিভাগে ভর্তি সোনালি ও তাঁর পরিবারের খোঁজখবর নেন তিনি। সভা থেকে সরাসরি আসার কারণে সংক্রমণের আশঙ্কায় সদ্যোজাত শিশুর কাছে যাননি তিনি। তবে সোনালি ও তাঁর মায়ের অনুরোধে শিশুপুত্রের নামকরণ করেন। সদ্যোজাতর নাম রাখা হয় ‘আপন’। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অভিষেক বলেন, ‘যেভাবে ওঁদের পর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তা কল্পনাও করা যায় না। এঁরা সবাই আমাদের আপন।’

Advertisement