দেশের স্বাধীনতা দিবসের দিন ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক গড়তে চলেছেন তাঁরা। গলে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ৬০০তম টেস্ট ম্যাচ খেলতে চলেছে ভারতীয় দল। আর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়ে আপ্লুত শুভমান গিল।
ভারতীয় ক্রিকেটের দীর্ঘ টেস্ট-অভিযানের এমন বিশেষ দিনে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিতে পারা, গিলের কাছে এক ‘বিশাল সম্মান’।
ভারতীয় ক্রিকেটের এই অভিযান শুরু হয়েছিল ১৯৩২ সালে, লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সেই যাত্রার ৬০০তম অধ্যায়ে অধিনায়ক হিসেবে নামতে চলেছেন শুভমান। স্বাধীনতা দিবসেই এই টেস্টের সূচনার ফলে এর তাৎপর্য অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। ভারতের চেয়ে শুধু ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াই সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলেছে।
টেস্ট শুরুর আগের দিন, শুক্রবার গলের সাংবাদিক বৈঠকে রোমাঞ্চিত গিল বলেন, ‘ভারতের হয়ে যে কোনও টেস্ট ম্যাচে অধিনায়কত্ব করাই আমার কাছে বড় সম্মান এবং গর্বের বিষয়। কিন্তু দেশের ৬০০তম টেস্টে অধিনায়কত্ব করা বিরাট সম্মান। তার উপর ম্যাচটা ভারতের স্বাধীনতা দিবসে শুরু হচ্ছে, তাই বিষয়টা আমার কাছে আরও বিশেষ’।
তবে শুধু আবেগ নয়, শ্রীলঙ্কা সফরে ভারতের সামনে রয়েছে কঠিন বাস্তবও। গৌতম গম্ভীরের কোচিংয়ে শেষ ২০টি টেস্টের মধ্যে ভারত জিতেছে আটটিতে, হেরেছে ১০টিতে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তালিকাতেও পিছিয়ে পড়েছে দল। তা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ভারত অধিনায়ক।
গিল বলেন, ‘গত এক বছরে আমরা যে ভাবে এগিয়েছি, তাতে আমি যথেষ্ট স্বস্তিতে আছি। আমার মনে হয়, আমরা সঠিক দিকেই এগোচ্ছি’। আগামী বছর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলাই যে লক্ষ্য, তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। গিলের কথায়, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য, আগামী বছর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলা। পরের ন’টি ম্যাচের মধ্যে ছ’টি বা সাতটি জিততে পারলে আমাদের সামনে সেই সুযোগ থাকবে’।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সিরিজের গুরুত্ব বোঝাতে ভারত অধিনায়ক আরও বলেন, ‘সেই জায়গায় পৌঁছতে হলে এই সিরিজটা জেতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন দলের প্রত্যেকের নজর সেদিকেই’।
তবে প্রথম টেস্টের আগে চোটও ভাবাচ্ছে ভারতকে। প্রথম সারির ব্যাটার সাই সুদর্শন খেলতে পারবেন না। প্রস্তুতি ম্যাচে অপরাজিত শতরান করা দেবদত্ত পাডিক্কল তাঁর জায়গায় প্রথম এগারোয় আসতে পারেন। অন্য দিকে, গলের জন্যও ম্যাচটি স্পেশ্যাল— এশিয়ার প্রথম মাঠ হিসেবে ৫০ টেস্ট আয়োজনের মাইলফলক ছুঁতে চলেছে এই স্টেডিয়াম।
শ্রীলঙ্কার সমস্যাও কম নয়। পাথুম নিশাঙ্ক এবং কুশল মেন্ডিসকে পাচ্ছে না তারা। তিন বছরেরও বেশি সময় পরে টেস্ট দলে ফিরতে পারেন নিরোশন ডিকওয়েলা। স্পিন-সহায়ক গলের উইকেট ব্যাটারদেরও সাহায্য করবে বলে জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কা অধিনায়ক ধনঞ্জয় ডি সিলভা।
অলরাউন্ডারের অভাব মেটাতে মানবে ভরসা
চোটের ধাক্কায় ভারতীয় টেস্ট দলে অলরাউন্ডারের অভাব। নীতীশ কুমার রেড্ডি এবং ওয়াশিংটন সুন্দরের না থাকায় শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টের আগে নতুন সমাধান খুঁজতে হচ্ছে শুভমান গিলকে। সেই পরিস্থিতিতে ভারত অধিনায়কের নজরে রাজস্থানের বাঁহাতি স্পিনার তথা অলরাউন্ডার মানব সুথার।
গল টেস্টের আগে সাংবাদিক বৈঠকে গিলের কথাতেই স্পষ্ট, সুথারকে শুধুমাত্র স্পিনার হিসেবে দেখছেন না তিনি। ব্যাট হাতেও তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠতে পারেন বলেই মনে করছেন ভারত অধিনায়ক। গিল বলেন, ‘আমার মনে হয়, মানবের মতো একজন ক্রিকেটার এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যাট হাতেও ওর সামর্থ্য রয়েছে। অবশ্যই অভিজ্ঞতা দরকার, নিজের উপর বিশ্বাস এবং আত্মবিশ্বাসও দরকার। আর সেটা তখনই আসবে, যখন কেউ মাঠে নামবে, খেলবে এবং রান করবে’।
এর পরেই সুথারের উপর আস্থার কথা আরও স্পষ্ট করে গিল বলেন, ‘আশা করি, এই সিরিজেই ও সেটা করে দেখাবে। বল হাতে ওর দক্ষতা অসাধারণ। আর আট নম্বরে খুব ভাল ব্যাটার হয়ে ওঠার ক্ষমতাও ওর রয়েছে’।
🗣️ The main goal is to play the World Test Championship Final#TeamIndia captain Shubman Gill talks about the progress of the team and the importance of the Sri Lanka Test series.#SLvIND | @ShubmanGill pic.twitter.com/qfSTwseB4d
— BCCI (@BCCI) August 14, 2026
ঘরোয়া ক্রিকেটে ৫১টি প্রথম শ্রেণির ইনিংসে তাঁর ১০০০-এর বেশি রান রয়েছে, আছে একটি শতরানও। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট একাদশের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে ৯০ বল খেলে ৪১ রান করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার সেই ক্ষমতাও নির্বাচকদের নজর এড়ায়নি। গিলের মন্তব্যেই ইঙ্গিত, তৃতীয় স্পিনার এবং অলরাউন্ডারের জায়গার লড়াইয়ে সুথারের সম্ভাবনাই বেশ জোরালো।
অন্য দিকে, দ্বিতীয় পেসারের জায়গা নিয়ে এখনও ধন্দে ভারতীয় শিবির। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ এবং গুরনূর ব্রারের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে দলকে। এই নিয়ে গিল বলেন, ‘দু’জনেই অত্যন্ত দক্ষ বোলার এবং প্রস্তুতি ম্যাচেও খুব ভাল বল করেছে। পুরনো বলে যখন বিশেষ কিছু হয় না, তখন গুরনূর কতটা কার্যকর হতে পারে, আমরা দেখেছি। ওর অতিরিক্ত গতি রয়েছে, বাউন্সও রয়েছে। ও যথেষ্ট লম্বাও’।
প্রসিদ্ধকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে গিল বলেন, ‘সম্প্রতি প্রসিদ্ধকে যত ভাল বল করতে দেখেছি, আগে কখনও দেখিনি। লাল বল হোক বা সাদা বল— দু’ধরনের ক্রিকেটেই ও দারুণ বল করছে। তাই আমাদের কাছে সিদ্ধান্তটা খুব কঠিন হবে’।
‘ শুধু স্পিনার নয়, পেসারদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ’*
শ্রীলঙ্কার স্পিনার-বান্ধব উইকেট নিয়ে প্রচুর চর্চা চলছে। বিশেষজ্ঞরা অনেকেই বলছেন, ভারতীয় ব্যাটারদের এই সিরিজে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। এই নিয়ে শুভমান বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে একটি বড় মিল হল, দু’দেশেই স্পিনারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার বল পুরনো হয়ে গেলে এখানেও ফাস্ট বোলারদের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে’।
পর্যাপ্ত প্রস্তুতির গুরুত্বও তুলে ধরে গিল জানান, টেস্ট শুরুর আগে অন্তত এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিন সময় পাওয়া গেলে ক্রিকেটারদের অপরিচিত পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সুবিধা হয়। বলেন,, ‘আমাদের যদি সেই সুযোগ থাকে এবং সূচি এমন হয় যে, টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগে অন্তত এক সপ্তাহ বা ১০ দিন সময় পাওয়া যায়, তা হলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অবশ্যই সুবিধা হয়’।
এই প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, “এই দলের বেশির ভাগ ক্রিকেটারেরই পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। এমন নয় যে, দলের অনেকের ঝুলিতে প্রচুর ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে তা অবশ্যই অনেক সাহায্য করে’।




