পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-কে ঘিরে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। বরং প্রায় ৩৪ লক্ষ আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকায় নতুন করে সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন— যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে আর কত সময় লাগবে? গণতন্ত্রে ভোট দেওয়ার অধিকার অত্যন্ত মৌলিক। সেই অধিকার নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর পাওয়ার প্রক্রিয়াও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সহজ হওয়া প্রয়োজন। এই জায়গাতেই সুপ্রিম কোর্টের মঙ্গলবারের পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই প্রক্রিয়া এমন ধীর হতে পারে না যে, পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচন এসে যাবে, অথচ আপিলের সিদ্ধান্তই হবে না। আদালত কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে অবশ্য রাজি হয়নি। কিন্তু ট্রাইব্যুনালগুলির কাজের গতি নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের কথায়, প্রক্রিয়া অনন্তকাল চলতে পারে না।
এই অবস্থায় প্রথম প্রয়োজন বাস্তব পরিস্থিতির একটি পরিষ্কার ছবি। কতগুলি আপিল জমা পড়েছে, কতগুলির শুনানি হয়েছে, কতগুলির নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতগুলি এখনও পড়ে রয়েছে— এই সমস্ত তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী ২৫ আগস্টের মধ্যে সেই পরিসংখ্যান দিতে বলা হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ্যে এলে বোঝা যাবে, ট্রাইব্যুনালগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর ভাবে কাজ করছে।
৩৪ লক্ষ আপিলের সংখ্যা ছোট নয়। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের অভিযোগ দ্রুত শুনে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যে কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু কঠিন বলেই পরিকাঠামোর দুর্বলতাকে মেনে নেওয়া যায় না। যদি এত সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তবে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ট্রাইব্যুনাল, কর্মী, প্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুতর। কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরীর আইনজীবী আদালতে জানিয়েছেন, মুর্শিদাবাদে বহু দরিদ্র মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং তাঁদের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। তাঁদের একমাত্র ভরসা স্থানীয় আপিল ব্যবস্থাই। সেই ব্যবস্থাও যদি ধীরগতির হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কার্যত অসহায় হয়ে পড়বেন।
এখানেই এসআইআর-এর গোটা প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা দরকার। ভোটার তালিকা নির্ভুল হওয়া যেমন জরুরি, তেমনই প্রকৃত ভোটারের নাম ভুল করে বাদ না পড়াও সমান জরুরি। মৃত ব্যক্তি, ভুয়ো ভোটার বা একাধিক জায়গায় নাম থাকা ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নিয়ে সাধারণত কোনও বিতর্ক নেই। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে যদি প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়ে, তবে তাঁকে দ্রুত সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। কারণ ভুল নাম বাদ পড়া শুধু প্রশাসনিক ভুল নয়, এর ফলে একজন নাগরিক তাঁর গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারাতে পারেন।
ট্রাইব্যুনালের সামনে তাই শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, মানুষের অধিকারও বিবেচ্য। প্রতিটি আপিলের ক্ষেত্রে যথাযথ নথি দেখা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া এবং নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়া যেন বছরের পর বছর না চলে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এই জায়গায় প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও বলেছেন, পরিসংখ্যান পাওয়ার পরে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে কী ভাবে নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো যায়, তা দেখা যেতে পারে। নথি ডিজিটাল করা, শুনানির তারিখ ও মামলার অবস্থা অনলাইনে জানানো, প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার সহজ ব্যবস্থা এবং মামলাগুলির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ— এসব ব্যবস্থা দ্রুত চালু করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তি যেন সাধারণ মানুষের জন্য নতুন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে আর একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাদ পড়া ভোটারদের সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সুপ্রিম কোর্ট সেটিকে এই মামলার পৃথক কারণ বলে জানিয়েছে এবং প্রয়োজনে কলকাতা হাই কোর্টে যাওয়ার কথা বলেছে। অর্থাৎ ভোটার তালিকা সংক্রান্ত আপিল এবং সরকারি সুবিধা পাওয়ার প্রশ্নকে এক করে ফেললে মূল সমস্যার সমাধান আরও জটিল হতে পারে। প্রতিটি বিষয়কে তার নিজস্ব আইনি কাঠামোর মধ্যে দ্রুত বিচার করাই সঠিক পথ।
সবচেয়ে বড় কথা, এসআইআর-কে রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার না বানিয়ে একটি প্রশাসনিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচালনা করা দরকার। ভোটার তালিকার শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। নির্বাচন কমিশনের সেই দায়িত্বও রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিকের ভোটাধিকার রক্ষার দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে আস্থার সংকট তৈরি হবে।
সুপ্রিম কোর্ট এখন যে পরিসংখ্যান চেয়েছে, সেটি তাই নিছক হিসাব নয়। এটি গোটা ব্যবস্থার কার্যকারিতার পরীক্ষা। ৩৪ লক্ষ মানুষের অপেক্ষা কোনও সাধারণ প্রশাসনিক ফাইলের অপেক্ষা নয়। প্রত্যেকটি আপিলের পিছনে রয়েছে একজন নাগরিকের অধিকার, একটি পরিবার এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার প্রশ্ন।
তাই ট্রাইব্যুনালগুলিকে দ্রুত কাজ করতে হবে। কিন্তু দ্রুততার নামে যেন ন্যায়বিচার বিসর্জন না যায়। প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ন্যায্য নিষ্পত্তি। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের আসল তাৎপর্য এখানেই— ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া শেষ করার তাগিদ যেমন আছে, তেমনই প্রকৃত ভোটারের অধিকার রক্ষা করার দায়ও রয়েছে। গণতন্ত্রে দুটির কোনোটিকেই উপেক্ষা করা যায় না।




