• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 12 August, 2026

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোনও এক ব্যক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হতে পারে না। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, নদীর জল, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, মানুষের যাতায়াত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

File Photo

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক এবং একই সময়ে সে দেশে ‘র’-প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে ভারতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা প্রতিনিধিদলের সফর— দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য যে দুই দেশই কথাবার্তার পথ খোলা রাখতে চাইছে, এই ঘটনাগুলি তারই ইঙ্গিত দেয়। তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলির একটি যে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তা-ও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ আবার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি তুলেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মী শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকা এখন স্পষ্টতই চাইছে, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা যে বিষয়গুলিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, সেগুলি নিয়ে ভারত দ্রুত পদক্ষেপ করুক।

ভারতের কাছে বিষয়টি নিছক একটি প্রশাসনিক বা আইনি প্রশ্ন নয়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিলেন। তাঁর সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তাঁর শাসনকালে সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের মতো বহু ক্ষেত্রে দুই দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ফলে তাঁর বর্তমান অবস্থানকে কেন্দ্র করে ভারত যে সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তার উপর তিনি যদি ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, তা হলে ঢাকার অস্বস্তি আরও বাড়ে। সম্প্রতি দিল্লি থেকে তাঁর বক্তব্যের পর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া যে তীব্র হয়েছে, তা তারই প্রমাণ।

ভারতের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এক দিকে বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, যাঁর সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে; অন্য দিকে বর্তমান বাংলাদেশের সরকার এবং সে দেশের জনমত। ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তা হলে এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তবে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রশ্নটিও আবেগ দিয়ে নয়, আইন ও ন্যায়বিচারের নীতির ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে। বাংলাদেশের আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়ার মান কী ছিল, মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সাজা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না— এই সমস্ত বিষয় ভারতকে যথাযথভাবে বিবেচনা করতে হবে। কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভারতের পক্ষে যুক্তিযুক্ত নয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের উদ্বেগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও দূরদর্শিতার পরিচয় হবে না।

আর একটি বিষয়ও উভয় পক্ষেরই মনে রাখা দরকার। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোনও এক ব্যক্তিকে ঘিরে আবর্তিত হতে পারে না। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, নদীর জল, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, মানুষের যাতায়াত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত।

সুতরাং এখন দরকার উত্তেজনা বাড়ানো নয়, বরং নীরবে এবং ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতকে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কাছ থেকেও প্রত্যাশা থাকবে, তারা ভারতের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাগুলিকে গুরুত্ব দেবে।

ভারত তার প্রতিবেশী এবং দীর্ঘ দিনের বন্ধু বাংলাদেশের সঙ্গে সব দিক থেকেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। সেই সম্পর্ক কোনও একটি সরকার বা কোনও একটি রাজনৈতিক দলের উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং মানুষের স্বার্থ।

তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদীর সম্ভাব্য বৈঠক সেই বৃহত্তর সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হতে পারে। মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু মতপার্থক্যকে সম্পর্কের স্থায়ী সংকটে পরিণত হতে দেওয়া যায় না। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে সিদ্ধান্তও সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই নিতে হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো থাকাটা শুধু কূটনৈতিক সাফল্য নয়, ভারতের নিজস্ব স্বার্থের দিকটিও ভাবতে হবে। তাই বর্তমান অস্বস্তির মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন সংযম, সংলাপ এবং পরস্পরের উদ্বেগকে বোঝার চেষ্টা। পারস্পরিক সম্পর্কের স্বার্থে আলোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়াটাই এখন দুই দেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।