২৫ জুন, ২০২৬। বেজিং। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান (Tarique Rahman) এবং চিনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং (Xi Jinping) বৈঠকে বসলেন। একগুচ্ছ চুক্তি সই হল। তার মধ্যে একটি অনেকেই মাথায় রাখেননি। বাগেরহাটের (Bagerhat) মোংলা বন্দরের (Mongla Port) পাশে ১১০ একর জমিতে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করবে চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (China Civil Engineering Construction Corporation)।
সেই ১১০ একর জমি আগে বরাদ্দ হয়েছিল ভারতের জন্য। এগারো বছর আগে।
ভারতের হাত থেকে কীভাবে গেল
২০১৫ সালে শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) সরকার ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে। মোংলায় ১১০ একর এবং মিরসরাইতে (Mirsarai) ৯০০ একর জমি বরাদ্দ হয় ভারতীয় বিনিয়োগের জন্য। ভারতের ছাড়ের ঋণে (Line of Credit) পুরো প্রকল্প হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু প্রকল্পটা সামনে এগোয়নি। ২০২২ সালে হিরানন্দানি গ্রুপের (Hiranandani Group) সঙ্গে একটি টার্ম শিট সই হয়। ২০২৩ সালে টেন্ডার ডাকা হয়। কিন্তু হিরানন্দানি গ্রুপ বা আডানি পোর্টস (Adani Ports) কেউই দরপত্র দেয়নি। কারণ ভারতের শর্ত ছিল, ৬৫ শতাংশ সামগ্রী ভারত থেকেই আনতে হবে, আর বাংলাদেশি ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া যাবে না। সেই শর্তে কেউ আগ্রহ দেখায়নি।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে পটপরিবর্তন হল। অক্টোবর ২০২৫-এ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের প্রকল্প বাতিল করল। জুন ২০২৫-এ ঢাকার চিনা দূতাবাস ওই একই জমিতে চিনা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার প্রস্তাব দেয়।
এবং জুন ২০২৬-এ বেজিংয়ে তা সরকারিভাবে সই হয়ে গেল।
মোংলা বন্দর পশ্চিমবঙ্গের কাছে কতটা গুরুত্বের
মোংলা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর, বঙ্গোপসাগরের (Bay of Bengal) মুখে। ভারতের স্থলসীমা থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে।
এই বন্দরটার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক শুধু মানচিত্রের নয়, আরও অনেকটা গভীর।
শেখ হাসিনার আমলে ভারত মোংলা এবং চট্টগ্রাম (Chittagong) বন্দর ব্যবহারের ট্রানজিট অধিকার পেয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে ভারত মোংলায় একটি টার্মিনাল পরিচালনার অধিকারও পায়। এছাড়া ৩,৩০০ কোটি টাকা খরচে ৬৫ কিলোমিটারের খুলনা-মোংলা রেলপথ (Khulna-Mongla Rail Link) তৈরি হয়েছিল ভারতের অর্থ সাহায্যে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে পণ্য পরিবহনের খরচ কমাতে।
ত্রিপুরার আগরতলা থেকে কলকাতায় পণ্য পাঠাতে শিলিগুড়ির পথে ১,৬০০ কিলোমিটার ঘুরতে হত। বাংলাদেশ হয়ে সেটা নেমে আসত ৬০০ কিলোমিটারে। সেই বিকল্প পথের সঙ্গে মোংলা যুক্ত হলে পুরো উত্তর-পূর্বের পণ্য কলকাতা বন্দরকে হাব করে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছতে পারত। পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা হত ভারতের পূর্বমুখী নীতির কেন্দ্রীয় অভিমুখ হিসেবে।
সেই সম্ভাবনাটাই এখন জটিল হল।
মৈত্রী এক্সপ্রেস (Kolkata-Dhaka Maitree Express), বন্ধন এক্সপ্রেস (Kolkata-Khulna Bandhan Express), মিতালী এক্সপ্রেস (Siliguri-Dhaka Mitali Express), তিনটি রেলপরিষেবাই ২০২৪ সালের জুলাই থেকে বন্ধ। বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্তে এফওয়াই ২৬-এ ব্যবসা হয়েছে ৪৪,২০২ কোটি টাকার। যার মধ্যে পেট্রাপোল (Petrapole) একাই ২৮,২০৩ কোটি। মোংলায় চিনের নিয়ন্ত্রণ এই বাণিজ্য পরিকাঠামোর ভবিষ্যতকে আরও অনিশ্চিত করবে।
চিকেনস নেক: গলার কাছে চাপ আরও বাড়ল
উত্তরবঙ্গের সেই সরু ভূমিখণ্ড, যাকে ডাকা হয় চিকেনস নেক (Chickens Neck) বা শিলিগুড়ি করিডর (Siliguri Corridor) নামে, তার উপর সংকট বাড়ল। ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বের আট রাজ্যে যাওয়ার এটিই একমাত্র স্থলপথ। সবচেয়ে সরু জায়গাটি মাত্র ২০-২৫ কিলোমিটার প্রশস্ত। এক দিকে বাংলাদেশ, অন্য দিকে নেপাল, উত্তরে ভুটান, চিনের চুম্বি উপত্যকা (Chumbi Valley) মাত্র ১৩০ কিলোমিটার। উত্তর-পূর্বের আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচলপ্রদেশের ৯৫ শতাংশ পণ্য পরিবহন এই সরু পথ দিয়েই হয়।
মোংলায় চিনের উপস্থিতি এই করিডরের ওপর নতুন ভূকৌশলগত চাপ তৈরি করে। ভারতের দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগরে চিনের একটা পা রাখা মানে ভবিষ্যতে সেখান থেকে নজরদারির সম্ভাবনা তৈরি হওয়া।
এর পাশাপাশি আরও একটি ঘটনা। বাংলাদেশের উত্তরে লালমনিরহাট (Lalmonirhat) জেলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের একটি পুরনো বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। সেই ঘাঁটিতে চিনা আধিকারিকদের পরিদর্শনের খবর ভারতের গোয়েন্দা মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার (Cooch Behar) জেলার মাত্র ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে। শিলিগুড়ি করিডর থেকে ১৩৫ কিলোমিটার। চিনের আওতার মধ্যে যদি ওই ঘাঁটি থেকে নজরদারি বিমান বা ড্রোন পরিচালিত হয়, শিলিগুড়ির সেনা চলাচল সরাসরি দৃষ্টিসীমায় আসতে পারে।
এই আশঙ্কায় ভারত ইতিমধ্যে পাল্টা পদক্ষেপ করেছে। ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর আসামের ধুবড়ির বামুনি (Bamuni), বিহারের কিষাণগঞ্জ (Kishanganj) এবং পশ্চিমবঙ্গের চোপড়ায় (Chopra) তিনটি নতুন সেনাছাউনি তৈরি হয়েছে। এস-৪০০ (S-400), ইন্দো-ইজরায়েলি এমআরএসএএম (MRSAM) এবং দেশীয় প্রযুক্তির আকাশ (Akash) ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা এই অঞ্চলে মোতায়েন।
মুক্তামালার সর্বশেষ মুক্তো
‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ (String of Pearls), ভারতকে চারদিক থেকে ঘেরার চিনা কৌশল। পাকিস্তানের গাওয়াদার (Gwadar), শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা (Hambantota) ৯৯ বছরের লিজে, ২০১৭ সালে পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে (Djibouti) সরাসরি সামরিক ঘাঁটি, মিয়ানমারের কিয়াউকপু (Kyaukpyu) বন্দর। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (Belt and Road Initiative / BRI) অধীনে চিন ভারত মহাসাগর অঞ্চলে একের পর এক বন্দরে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে।
নৌ-ইতিহাসবিদ আলফ্রেড মাহান (Alfred Mahan) বলেছিলেন, যে শক্তি হিন্দ মহাসাগরকে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটিই এশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করবে। মোংলা সেই মুক্তামালার সর্বশেষ মুক্তো। বঙ্গোপসাগরের মুখে, পশ্চিমবঙ্গের পাশে।
এই মুক্তামালায় মোংলা যুক্ত হলে চিন পশ্চিম থেকে পূর্বে– ভারতকে একটা অর্ধবৃত্তে ঘিরে ফেলে। একইসঙ্গে বেজিংয়ে তারিক রহমানের সফরে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় (Anwara) আরেকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির দায়িত্ব পাচ্ছে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশন (China Road and Bridge Corporation)। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চিনের সহায়তার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের মুখ বরাবর চিনের দুটো অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তার জলে চিনের হাত। ছবিটা আকস্মিক নয়। আশঙ্কার।
শেষ প্রশ্নটা ভারতের নিজেরই
মোংলায় ভারত হারল কোথায়? খানিকটা গড়িমসিতেই। ২০১৫-তে চুক্তি, ২০১৮-তে ঠিকাদার মনোনীত, ২০২৩-এ টেন্ডার, কিন্তু কাজ শুরু হয়নি। বাংলাদেশ বারবার অনুরোধ করেছিল, বাংলাদেশি ঠিকাদারকেও সুযোগ দেওয়া হোক। ভারত রাজি হয়নি। তারপর কোনও ভারতীয় সংস্থাই বিড দেয়নি।
ভারতের দেরির সুযোগে বেজিং নিজের নাম লিখিয়ে নিল।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপট থেকে ছবিটা এই রকম। পূর্বে বাংলাদেশে চিনের দুটো অর্থনৈতিক অঞ্চল, উত্তরে সিকিম-ভুটান ঘেঁষে চিনের পরিকাঠামো, পশ্চিমে নেপালে চিনের বিনিয়োগ। মাঝখানে পশ্চিমবঙ্গ। ফলে শিলিগুড়ি করিডর বেশ সংকটে।
বেজিংয়ে যে সইসাবুদ হল, তার ওজনটা এখানেই।




