বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) মঞ্চে ফুটবল তারকাদের নিরাপত্তা নিয়ে কত বড় আশঙ্কা ছিল, তা সামনে এল ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে। ফাঁস হওয়া পুলিশের একটি নথিতে দাবি করা হয়েছে, আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে (Lionel Messi) খুন করার ছক কষেছিল এক আমেরিকান। শুধু মেসি (Lionel Messi) নন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো-সহ একাধিক তারকাকেও টার্গেট করা হয়েছিল বলে ওই নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, মেসিকে (Lionel Messi) খুন করার হুমকির ধরন ছিল ভয়াবহ। সবচেয়ে গুরুতর হুমকিগুলির একটি এসেছিল আর্জেন্টিনা বনাম জর্ডন ম্যাচের আগে। এক ব্যক্তি ডালাস বিমানবন্দরে ফোন করে দাবি করেন, তিনি আরও দু’জনের সঙ্গে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে ‘ঘরে তৈরি বোমা এবং একটি এআর-১৫’ (আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল)। তিনি জানান, তাঁদের লক্ষ্য ‘দুই দলের পুলিশকর্মী এবং খেলোয়াড়েরা’। ওই অভিযুক্ত হামলাকারী বিশেষ ভাবে লিওনেল মেসির (Lionel Messi) নামও উল্লেখ করেছিল।
মেসিকে (Lionel Messi) ঘিরে আরও একটি হুমকির খবর পাওয়া যায় ৭ জুলাই আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচের সময়। রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘এক্স’-এ একজন লিখেছিলেন, ‘আমি আটলান্টার স্টেডিয়ামে ঢুকতে চলেছি এবং শরীরে চারটি বোমা বেঁধে মেসিকে উড়িয়ে দেব।’
এর পাশাপাশি, আরও এক ব্যক্তি পুলিশকে ফোন করে দাবি করেন, তিনি স্টেডিয়ামের তিনটি আবর্জনার পাত্রে ‘তিনটি বোমা’ রেখে এসেছেন। এর পরেই বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত কুকুরের হ্যান্ডলার এবং তাদের কে-৯ দল স্টেডিয়ামে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। ম্যাচ চলাকালীন এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পরেও চলে সেই তল্লাশি।
ফাঁস হওয়া নথিতে মেসিকে (Lionel Messi) সবচেয়ে বড় ‘টার্গেট’-গুলির অন্যতম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর পাশাপাশি রোনাল্ডো এবং আরও কয়েক জন ফুটবলার, রেফারি ও আধিকারিকের বিরুদ্ধেও হুমকি এসেছিল। ফলে বিশ্বকাপের মতো বিশাল টুর্নামেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলিকে একাধিক সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে কাজ করতে হয়েছিল।
পুলিশের তদন্তে শুধু শারীরিক হামলার পরিকল্পনাই নয়, অনলাইনে ফুটবলারদের উদ্দেশে হুমকি এবং লাগাতার হয়রানির বিষয়টিও সামনে আসে। তদন্তকারীরা বিভিন্ন অনলাইন পোস্ট ও বার্তা খতিয়ে দেখেন এবং সম্ভাব্য বিপদের মাত্রা বোঝার চেষ্টা করেন।
নথি অনুযায়ী, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোই ছিলেন সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার। ১৪ জুন ফিফার এক কর্মী এক ‘সন্দেহজনক ব্যক্তি’ সম্পর্কে অভিযোগ করেন। ওই ব্যক্তি পর্তুগিজ ফুটবলারের থাকার জায়গা সম্পর্কে ‘বিশদ তথ্য’ জানতে চেয়েছিলেন। তবে দু’দিন পরেই হিউস্টন পুলিশ রোনাল্ডো যে হোটেলে দলের সঙ্গে ছিলেন, সেখান থেকে ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে।
রোনাল্ডো কানাডায় থাকার সময়ও একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এক সমর্থক পর্তুগিজ তারকার সঙ্গে লিফটে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁকে বাধা দেওয়া হলে তিনি দাবি করেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শুধু সিআর সেভেনের সঙ্গে একটি সেলফি তোলা।
রোনাল্ডোকে ঘিরে আরও কয়েকটি ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে নথিতে। মায়ামিতে এক ব্যক্তি তাঁর কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছিলেন। আবার পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ চলাকালীন রোনাল্ডোর জার্সি পরা এক দর্শক মাঠে ঢুকে পড়েন।
আরও পড়ুন: চোটের মিছিল ভারতীয় দলে, কবে মাঠে ফিরবেন বুমরাহ, কারো জানা নেই, নতুন ধাক্কা হার্দিকের
বিশ্বকাপের (FIFA World Cup) আরও বেশ কয়েক জন ফুটবলারকে নিশানা করা হয়েছিল বলে খবর। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপে। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে উত্তপ্ত বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে লক্ষ্য করে ‘বিদ্বেষমূলক ও জেনোফোবিক’ মন্তব্য করা হয়। এমনকি সমাজমাধ্যমে এক প্যারাগুয়ের সেনেটরও এমবাপের কড়া সমালোচনাও করেন। আরো ঘটনায়, রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকার ছবি দেওয়া একটি পুতুল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেই ঘটনার ভিডিও সমাজমাধ্যমে ফের ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ফুটবলারদের পাশাপাশি রেফারিরাও হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের-এর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে ছ’হাজারেরও বেশি হুমকির বার্তা পাঠানো হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচে তাঁর বিতর্কিত পারফরম্যান্সের পরই এই ঘটনা ঘটে। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জেতে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই হুমকির বার্তাগুলির বেশির ভাগই এসেছিল মিশরের নাগরিকদের কাছ থেকে।
বিশ্বকাপ (FIFA World Cup) চলাকালীন নিরাপত্তার বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবেই অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। এখন পুলিশের নথি প্রকাশ্যে আসার পর বোঝা যাচ্ছে, মাঠে ফুটবলারদের নিরাপত্তার জন্য কত বড়সড় প্রস্তুতি চালাতে হয়েছিল।
মেসির (Lionel Messi) ক্ষেত্রে আশঙ্কা আরও বেশি ছিল। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক এবং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হিসাবে তাঁকে ঘিরে বিপুল জনসমাগম হয় প্রতি ম্যাচেই। ফলে কোনো হুমকিকেই হালকা ভাবে নেওয়ার উপায় ছিল না নিরাপত্তা সংস্থাগুলির।
দেখুন: ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় যমুনার জলে আটকে পড়া পশু উদ্ধার
তবে পুলিশের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত কোনও হামলা ঘটেনি। বিশ্বকাপ (FIFA World Cup) নির্বিঘ্নে শেষ করার পর এখন সেই সময়ের গোপন নিরাপত্তা-নথি প্রকাশ্যে আসায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে ফুটবল দুনিয়ায়। মেসি (Lionel Messi)-রোনাল্ডোর মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা যে শুধু মাঠের প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়েননি, মাঠের বাইরেও তাঁদের ঘিরে ছিল শত্রুরা—এই ঘটনায় সেটাই আরও এক বার স্পষ্ট হল।




