গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যেভাবে পড়েছে, তাতে অর্থনীতিবিদরা একম যে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় খলনায়কের বিদায়। ব্রেন্ট ক্রুডের (Brent Crude) দাম এক মাসেই প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছে, ২০২০ সালের পর এটাই সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক পতন। কিন্তু এই স্বস্তির গল্পে নতুন মোচড় দিয়েছে ইরান। আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসতে ইরানের রাজি না হওয়ার খবরে বুধবার ব্রেন্টের দাম আবার কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩.২ ডলার প্রতি ব্যারেল (প্রায় ৬,৯৩৩ টাকা), আর আমেরিকান বেঞ্চমার্ক ডব্লুটিআই (WTI) ৬৯.৭ ডলারে (প্রায় ৬,৬০০ টাকা)। অর্থাৎ, যুদ্ধবিরতি বহাল থাকলেও শান্তির ললিত বাণী এখনও পরিহাস বই কিছু নয়।
কেন তেলের দামই ভারতের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র
ভারত তার প্রয়োজনের প্রায় ৮৫ শতাংশ তেল আমদানি করে। তেলের দাম কমলে আমদানি খরচ কমে, টাকার উপর চাপ কমে, আর মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাও কমে। এই কারণেই পশ্চিম এশিয়ায় (West Asia) সংঘাত কিছুটা স্তিমিত হতেই বিদেশি বিনিয়োগ সংস্থাগুলো একে একে ভারতের বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে দিয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাক্স (Goldman Sachs) সাম্প্রতিক রিপোর্টে চলতি ক্যালেন্ডার বছরের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে করেছে ৬.৮ শতাংশ, মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে করেছে ৪.৪ শতাংশ। তাদের যুক্তি, তেলের দাম কমায় জ্বালানির খুচরো দাম আর বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না, সারের ভরতুকির খরচও কমবে।
কিন্তু সবাই এতটা আশাবাদী নয়। সুইস ব্যাংক ইউবিএস (UBS) উলটো পথে হেঁটে আগামী অর্থবর্ষের বৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে করেছে ৬.২ শতাংশ। তাদের আশঙ্কা, তেলের দাম আবার বাড়লে এবং বৃষ্টিপাত কম হলে গ্রামীণ চাহিদা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। ডিবিএস ব্যাঙ্কের (DBS Bank) অর্থনীতিবিদ রাধিকা রাও জানিয়েছেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে সুদের হার বাড়াবে না, বরং সতর্ক অবস্থানেই থাকবে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সতর্কতা
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (RBI) মুদ্রানীতি কমিটি গত বৈঠকে সুদের হার ৫.২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে, তবে কমিটির সুর ছিল সতর্ক। তারা আগামী অর্থবর্ষের বৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ৬.৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে করেছে ৬.৬ শতাংশ, আর মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে করেছে ৫.১ শতাংশ। গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা স্পষ্ট বলেছেন, পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘায়িত সংকট আর দুর্বল বর্ষা, দুটোই ঝুঁকির তালিকায় ওপরে। টাকাকে চাঙ্গা রাখতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর ছাড় এবং একাধিক পদক্ষেপও করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।
বৃষ্টি যতটা হবে ভাবা হয়েছিল, ততটা নেই
জুন মাসে গোটা দেশে বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম, ১৯০১ সালের পর পঞ্চম সবচেয়ে শুকনো জুন। পূর্ব এবং উত্তরপূর্ব ভারতে জুন মাসের বৃষ্টি রেকর্ড শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন। জুলাইয়ের জন্যও আইএমডি স্বাভাবিকের কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে, যদিও উত্তরপশ্চিম আর উত্তরপূর্ব ভারতের কিছু অংশে স্বাভাবিক থেকে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এল নিনোর (El Nino) প্রভাব আর দুর্বল বর্ষার জোড়া ফলায় খরিফ ফসলের চাষ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে ছবিটা দ্বিমুখী
রাজ্যের ক্ষেত্রে ছবিটা বেশ ভিন্ন। উত্তর আর দক্ষিণে এর প্রভাব একেবারেই আলাদা। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং, কোচবিহারে এই সপ্তাহে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে, যা চা বলয়ের জন্য স্বস্তির খবর। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ থাকছে স্বাভাবিকের নিচে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বর্ধমান, হুগলি, নদিয়ার ধান চাষে। অন্যদিকে তেলের দাম কমায় রাজ্যের পরিবহন এবং শিল্পখাতে খরচে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে, যদিও পাম্পে পেট্রল-ডিজেলের দাম কমার সম্ভাবনা এখনও নিশ্চিত নয়, কারণ কেন্দ্র এবং তেল সংস্থাগুলো এখনও রক্ষণশীল অবস্থানেই আছে।
ভারতের অর্থনীতির গল্পে এক খলনায়ক সরে দাঁড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু মঞ্চ থেকে পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। দ্বিতীয় ভিলেন এল নিনো এখনও তো দারুণ সক্রিয়। অর্থাৎ, সামগ্রিকতার নিরিখে ইরানের অনড় মনোভাব আর রুষ্ট প্রকৃতি, এই দুটো অনিশ্চয়তা এখনও ভবিষ্যতের হিসেবকে জটিল করে রাখছে।




