রাত জাগা শুরু হয়ে গিয়েছে। সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে শুধু অপেক্ষা করছেন তাদের প্রিয় দলের খেলা দেখার জন্য। প্রথম দিনের খেলা দেখে সবাই এখন আগামী খেলাগুলির ফলাফল কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে কিন্তু অঙ্ক কষেই চলেছে। আগামী শনিবার কানাডা খেলবে বসনিয়া ও হার্জেগোভিন দলের সঙ্গে। আর অন্য ম্যাচটি রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলসে। সেখানে মুখোমুখি হবে আমেরিকা ও প্যারাগুয়ে। এটা মনে রাখতে হবে, এবারের বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের মধ্যে কানাডা ও আমেরিকা রয়েছে। তাই এই দুই দেশের খেলাকে ঘিরে অবশ্যই অনেক প্রশ্ন থাকবে। তার প্রধান কারণ হল, প্রথম সাক্ষাৎকারে আয়োজক কানাডা এবং আমেরিকার লড়াকু ভূমিকা কীভাবে প্রকাশ পায়, তা দেখার জন্য। গ্রুপ ‘বি’-তে রয়েছে কানাডা এবং বসোনিয়া। আর গ্রুপ ‘ডি’-তে খেলবে আমেরিকা ও প্যারাগুয়ে।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে কানাডা রয়েছে ৩০তম স্থানে। আয়োজক দেশ হিসেবে সরাসরি বিশ্বকাপ খেলবে তারা। ঘরের মাঠে খেলবে, তাই বাড়তি সুবিধা অবশ্যই পাবে। প্রস্তুতি ম্যাচে কানাডা ২-০ গোলে জয় পেয়েছিল উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে। স্বাভাবিকভাবে এই জয় কানাডাকে উজ্জীবিত করেছে। শুধু তাই নয়, কানাডার খেলা দেখে উজবিকিস্তানের কোচ উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এবারে কানাডা দলে বেশকিছু প্রতিভাবান ফুটবলার রয়েছেন,যাঁরা প্রতিপক্ষ দলকে চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। শুধু তাই নয়, বিপক্ষে যাঁরা খেলবেন, তাঁরা কিন্তু বেশ সমস্যায় পড়বেন, এমন ধারণা ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। অবশ্য এর আগেও দু-দু’বার কানাডা বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নিয়েছিল। ১৯৮৬ ও ২০২২ বিশ্বকাপে কানাডা বিশ্বকাপ খেললেও কোনও ম্যাচে জিততে পারেনি। তাই গ্রুপ পর্বেই তাদের বিদায় নিতে হয়। এবারের ছবিটা কিন্তু অনেকটাই বদলে গেছে। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আগে তারা যেভাবে দলটাকে গুছিয়ে নিয়েছে, তাতে বলতেই পারা যায় বেশ শক্তিশালী দল। আবার যখন দেশের মাটিতে খেলছে, সেই কারণে প্রত্যাশা থাকবে সেরা খেলা উপহার দেওয়ার জন্য। অনেকেই বলছেন, কানাডার ফুটবল ইতিহাসে এবারের দলটা সেরা দল। দলের কোচ জেসি মার্শ নিজেও স্বীকার করেছেন, এবারের বিশ্বকাপে তাঁরা অঘটন ঘটাতে পারেন।
কানাডা দলের সবচেয়ে ভরসার নাম বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড় আলফান্সো। তিনি যেমন রক্ষণভাগ সামলাবেন, আবার হঠাৎ হঠাৎ রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণে উঠে এসে গোল করার পরিস্থিতি তৈরি করে দেন। এই মুহূর্তে তিনি বিশ্বের সেরা রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম। এছাড়াও রয়েছেন দলে মোয়েস বম্বিতো ও রিচি দারিয়া। তাঁদের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের দৌড় কিন্তু একটা প্লাস পয়েন্ট। কোচ সবসময়ই চেষ্টা করেন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের বেশি জায়গা দিয়ে মাঝমাঠটাকে আক্রমণে উৎস বলে চিহ্নিত করা। অন্যদিকে বসোনিয়া ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬৫তম স্থানে রয়েছে। এ নিয়ে তারা দু’বার বিশ্বকাপে মূলপর্বে খেলার ছাড়পত্র পেল। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালির স্বপ্ন ভঙ্গ করে মূলপর্বে ছাড়পত্র পেয়েছে। এদিন জেকোরারা প্লেঅফের সেমিফাইনাল ম্যাচে তারা ওয়েলকে হারিয়ে দিয়েছে। ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে দুরন্ত জয় তুলে নিয়েছে। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার প্রথমবার সুযোগ পেয়েছিল। তাই ১২ বছর বাদে আবার তারা বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। এই দলে সবচেয়ে ভরসা বলতেই ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি স্ট্রাইকার জেকো। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপেও তিনি প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। যোগ্যতা অর্জনপর্বে তিনি ছ’টি গোল করেছেন। এ বাদেও নজর থাকবে ২১ বছর বয়সী ফুটবলার এরমিন মাহমিচের দিকে। সাধারণত তিনি মাঝমাঠে খেললেও আক্রমণে গতি বাড়াতে চমক দিয়ে উপরে উঠে আসেন। দলের খেলোয়াড়দের হার না মানা একটা জেদ সবসময় খেলা করে। এই অর্থে বলতে পারা যায় আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবে বসোনিয়া।
আবার আয়োজক দেশগুলির মধ্যে রয়েছে আমেরিকা। আমেরিকা ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে রয়েছে ১৬তম স্থানে। আয়োজক দেশ হিসেবে তারা অংশ নিচ্ছে মূল পর্বে। সেই অর্থে আমেরিকার সাফল্য বলতে ১৯৩০ সালে। তারা সেমিফাইনাল ম্যাচে হার স্বীকার করেছিল। দলের হাতিয়ার বলতে ফরওয়ার্ডে ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ। মাঝমাঠে খেলবেন ওয়েস্টন ম্যাককেনি। কোচ মৌরিসিয়ো পোচেত্তিনা। তাদের রণকৌশল বলতে রক্ষণভাগকে শক্তিশালী করতে চারজন খেলোয়াড়ের মাঝখানে আরও একজন খেলোয়াড় থাকবেন। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে ছক পরিবর্তন করে ৩-৫-২ এই অঙ্কেও খেলতে পারেন ফুটবলাররা।
আমেরিকার সঙ্গে প্রথম ম্যাচে মাঠে নামছে প্যারাগুয়ে। এই নিয়ে তারা ন-ন’বার বিশ্বকাপ খেলতে নামছে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে শেষ আটে পৌঁছে গিয়েছিল। দক্ষিণ আমেরিকার গ্রুপ থেকে ছয়ে শেষ করে বিশ্বকাপ খেলার ছাড়পত্র পায়। তবে তাদের কাছে সবচেয়ে প্রেরণা বলতে দুই শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে তারা জয় পেয়েছিল। ব্রাজিলকে তারা হারিয়েছিল ১-০ গোলে। আর আর্জিন্টিনার বিরুদ্ধে জয় তুলে নিয়েছিল ২-১ গোলের ব্যবধানে। স্বাভাবিকভাবে এই জয়ের ফলে প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী রয়েছেন এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে নজির সৃষ্টি করার জন্য। মাঝমাঠে তারা অত্যন্ত দুরন্ত ভূমিকা পালন করে। সেই কারণেই তারকাসম্পন্ন দলগুলির বিরুদ্ধে প্যারাগুয়ে জিতলে কোনও অবাক হওয়ার কারণ থাকবে না। সাধারণত দু’টি ছকে তারা খেলে থাকে। কখনও ৪-২-৩-১ ছকে আক্রমণ গড়ে তোলার চেষ্টা করে, আবার কখনও ৪-৪-২ ছকে খেলে প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। আবার দেখা যায় প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়ার জন্য মাঝমাঠে খেলোয়াড় বাড়িয়ে দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। দলের প্রধান ভরসা বলতে হুলিয়ো এনসিসোর মতো সেরা ফুটবলার।




