এক দফা ভোটগ্রহণ শেষ হলেই সাধারণত স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনের পর সেই স্বস্তি যেন সম্পূর্ণ নয়— বরং তার চারপাশে ঘনীভূত হয়েছে সন্দেহ, অভিযোগ ও পাল্টা ব্যাখ্যার ধোঁয়াশা। ফল ঘোষণার আগের এই সময়টা তাই শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনার নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থারও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এবারে বিশেষভাবে আলোচিত। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী শক্তি বিজেপির মধ্যে লড়াই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ক্ষমতা ধরে রাখা বা দখল করার তীব্রতা প্রায় সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। তবে এই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, বিশেষত নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে।
Advertisement
গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ রেফারির মতো দেখা হয়, যার উপর সকল পক্ষের সমান আস্থা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই আস্থায় চিড় ধরেছে বলেই মনে হচ্ছে। ভোটার তালিকার পুনর্বিবেচনা বা সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যের আশঙ্কা। যদি এই অভিযোগের সামান্য অংশও সত্য হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
Advertisement
ভোটাধিকার কোনও সাধারণ অধিকার নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার। নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করেও যদি কোনও নাগরিক ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষয়। বিচ্ছিন্ন হিংসাত্মক ঘটনা, বুথ দখলের চেষ্টা বা ইভিএম নিয়ে সন্দেহ— এসব অতীতে বহুবার দেখা গিয়েছে। কিন্তু এবারের মতো ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ এত ব্যাপকভাবে সামনে আসা পরিস্থিতিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সব প্রশ্নের সমাধান করতে পারেনি। যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, তাঁদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই আপিলের মাধ্যমে পুনর্বহাল হতে পেরেছেন। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ এবং নাগরিকবান্ধব ছিল?
অবশ্যই, এত বিপুল সংখ্যক ভোটারের মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। একটি রাজ্যের ভোটার সংখ্যা অনেক সময় একটি মাঝারি পশ্চিমি দেশের মোট জনসংখ্যার সমান। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক দক্ষতা ও পরিকাঠামোগত সক্ষমতাকে খাটো করা যায় না। তবুও, এই সাফল্যের আড়ালে যদি মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণার মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান। ইভিএম ব্যবহারের ফলে গণনার কাজ দ্রুত হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ ও জল্পনার জন্ম দেয়। এই ফাঁকটিই নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্মভূমি হয়ে ওঠে, যা গণতন্ত্রের জন্য মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আবেগের ভূমিকা বরাবরই প্রবল। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনা যেন যুক্তিবোধকে গ্রাস না করে, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটারদের অধিকার সুনিশ্চিত করা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করা— এই দুটি বিষয়কে সামনে রেখে এগোতে হবে।
ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হল ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে আরও সময়োপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে তালিকা সংশোধনের বদলে, বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এই কাজ করা উচিত– যাতে কোনও প্রকৃত ভোটার বাদ না পড়েন, আবার মৃত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের নামও তালিকায় না থাকে। এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রয়োজন, যাতে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।
সবশেষে, গণতন্ত্র কেবল ভোটগ্রহণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয় না; তা পূর্ণতা পায় তখনই, যখন প্রতিটি যোগ্য নাগরিক নির্বিঘ্নে তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। সেই অধিকার যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে গণতন্ত্রের ভিতও নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই এখনই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের পথে এগোনো— যাতে ভবিষ্যতের নির্বাচন আরও বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে।
Advertisement



