• facebook
  • twitter
Wednesday, 4 March, 2026

উত্তরপ্রদেশের দেবা শরিফে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে মাতেন রঙের খেলায়

এখানে একই সঙ্গে ধ্বনিত হয় ‘জয় শ্রী রাম’ ও ‘আল্লাহু আকবর’

উত্তরপ্রদেশের বারাবাঙ্কিতে অবস্থিত দেবা শরিফ প্রতি বছর হোলির সময়ে এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়। ঊনবিংশ শতকের সুফি সাধক হাজি ওয়ারিস আলি শাহের মাজার প্রাঙ্গণ রঙ, ভক্তি ও সম্প্রীতির আবহে ভরে ওঠে। এখানে একই সঙ্গে ধ্বনিত হয় ‘জয় শ্রী রাম’ ও ‘আল্লাহু আকবর’—যা উৎসবটিকে শুধু আনন্দের নয়, ঐক্যের প্রতীকেও পরিণত করেছে।

দেবা শরিফের হোলি অন্য জায়গার থেকে আলাদা। আবিরের সঙ্গে মিশে যায় গোলাপের পাপড়ি, ভেসে আসে সুফি কবিতার সুর। ধর্ম, জাতপাত বা পরিচয়ের বিভাজন এখানে গলে যায় বসন্তের রঙে। হিন্দু, মুসলিম, শিখ—নানা সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে রঙ মেখে শুভেচ্ছা জানান। অনেকের কাছে এই উৎসবের মূল বাণী—‘যে রব, সেই রাম’—যা ভক্তির একাত্মতাকেই তুলে ধরে।

Advertisement

স্থানীয়দের মতে, সাধকের সমাধি নির্মাণে এক হিন্দু ভক্ত রাজা পঞ্চম সিংহের ভূমিকা ছিল। সেই ইতিহাসই এই তীর্থক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনাকে আরও দৃঢ় করেছে। আজও বহু হিন্দু ভক্ত ওয়ারিস আলি শাহকে শ্রীকৃষ্ণের রূপ হিসেবে মানেন। আশপাশের এলাকায় ‘ওয়ারিস সরকার’ লেখা গাড়ি বা বাড়ি চোখে পড়ে। উল্লেখ্য, হোলির দিনে এখানে কখনও কখনও মুসলিমদের চেয়েও বেশি হিন্দু ভক্তের সমাগম হয়।

Advertisement

দীর্ঘদিন ধরে এই উৎসবে যোগ দেওয়া বহু মানুষের কাছে দেবা শরিফ মানে মিলনের বার্তা। রঙ যেমন সহজে মুছে যায় না, তেমনই এই সম্প্রীতির স্মৃতি মনে গেঁথে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে যখন বিভেদ বাড়ছে, তখন দেবা শরিফের সুফি হোলি সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

চার দশক ধরে এই মিলনোৎসবে নিয়মিত আসছেন প্রতাপ জয়সওয়াল। তাঁর কথায়, একসময় হোলি মানেই ছিল ঘরোয়া উদযাপন। কিন্তু প্রথমবার দেবা শরিফে এসে বসন্তের রঙে এমনভাবে ভেসেছিলেন যে, সেই অনুভূতি আজও অমলিন। তাঁর মতে, এখানে শুধু রঙ খেলা হয় না—মানুষে মানুষে হৃদয়ের দূরত্বও কমে যায়।

মাহোবা থেকে প্রতি বছর আসেন মহম্মদ নাতিক। তিনি বলেন, রমজান ও হোলি একসঙ্গে পড়লে উৎসবের মাহাত্ম্য যেন আরও বেড়ে যায়। একদিকে সংযম ও প্রার্থনার বার্তা, অন্যদিকে রঙের উচ্ছ্বাস—দুটি ভিন্ন আবহ একসঙ্গে মিলেমিশে এক অনন্য সম্প্রীতির ছবি তৈরি করে।

শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রথা আজও অটুট রয়েছে। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, কিন্তু দেবা শরিফের এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য বদলায়নি। মুখে-গায়ে লেগে থাকা রঙ যেমন সহজে মুছে যায় না, তেমনই হৃদয়ে থেকে যায় মিলনের স্পর্শ। ধর্ম বা পরিচয়ের ভেদরেখা পেরিয়ে মানুষ এখানে খুঁজে পান একসঙ্গে থাকার আনন্দ—যা সব সম্প্রদায়কে বেঁধে রাখে এক অটুট বন্ধনে।

Advertisement