গৌতম পতি
একসময় পৃথিবী ছিল রঙে ভরা এক বিস্ময়কর গ্রহ। নীল সমুদ্র, নীল আকাশ, সবুজ বন, লাল মাটির পথ, নানা রঙের ফুল, নানান জাতের পাখি— সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই রঙের উৎসগুলো একে একে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর বুক থেকে রঙের বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছ। এ এক গভীর সংকেত, যা প্রকৃতির অসুস্থতার লক্ষণ!
প্রথমেই আসে বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ধ্বংস। একসময় যে বনাঞ্চলে অসংখ্য রঙিন প্রজাতির ফুল, ফল, পাখি, প্রজাপতি ও নানা কীটপতঙ্গ দেখা যেত, আজ সেখানে কেবল ধূসর কংক্রিটের দেয়াল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাজন অরণ্যের প্রতিদিনের বৃক্ষনিধন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে কেবল অক্সিজেনই কমাচ্ছে না, মুছে দিচ্ছে অগণিত রঙের ছটা। শহুরে দূষণ ও বন উজাড়ের ফলে বহু রঙিন পাখি যেমন তোতা, ময়ূর বা প্রজাপতির বিরল প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। ছোটবেলায় বহুবার রামধনু দেখে আনন্দে আত্মহারা হলেও, দীর্ঘদিন প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকূল থাকা সত্বেও আকাশের বুকে রামধনুর দেখা পাইনি। ছোটবেলায় গাঁয়ের বাগানে যত প্রজাপতি, ফড়িং, মথ, মৌমাছি ও জোনাকি দেখা যেত এখন গাঁয়ে থাকলেও এদের দেখা পাওয়া দুষ্কর। প্রকৃতপক্ষে আলোর প্রভাবে এবং চেতনার রঙে রঙিন হয়ে পৃথিবী আমাদের কাছে ধরা দেয়। পৃথিবীর বুক থেকে রঙের বৈচিত্র্য দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি, মানুষের লোভ ও অপরিণামদর্শী কার্যকলাপ। বিশ্ব উষ্ণায়ন, খাদ্য শৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়া, জলস্তর বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত শব্দ ও আলোর দূষণের মতো মনুষ্য সৃষ্ট ঘটনাগুলি এই বর্ণময় পৃথিবীর ওপর চরম আঘাত হানছে।
বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন হলো এই সংকটের মূল কারণ। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। জীববৈচিত্র্য হলো প্রকৃতির রঙের মূল উৎস। লক্ষ লক্ষ উদ্ভিদ ও প্রাণীর নিজস্ব রঙ প্রকৃতিতে যে বৈচিত্র্য আনে, তা মনোমুগ্ধকর। কিন্তু বনভূমি ধ্বংস, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্য ব্যাপকহারে হ্রাস পাচ্ছে। এরফলে প্রকৃতির খাদ্য শৃঙ্খল নষ্ট হচ্ছে। অনেক প্রাণী খাদ্যের অভাবে মারা পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনেক ফুলের প্রজাতি তাদের প্রজননের সময় হারাচ্ছে। পরাগ মিলনের জন্য প্রয়োজনীয় পতঙ্গের বড্ড অভাব অনুভূত হওয়ার জন্য উদ্ভিদের কৃত্রিম প্রজননের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। আবার দূষণ ও পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে বহু রঙিন ফুল ও গাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। অনেক গাছপালা তাদের পাতা বা ফুলের রঙ পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। রঙিন পাখি, প্রজাপতি, বা উভচর প্রাণীরা তাদের আবাসের সংকটে বিলুপ্ত হচ্ছে। বন্যপ্রাণীরা তাদের রঙ ব্যবহার করে শিকারি বা শিকারের কাছ থেকে নিজেদের রক্ষা করে। সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে মিলনের সংকেত পাঠায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই রঙগুলি তাদের জন্য কার্যকর থাকছে না, যা তাদের বিলুপ্তির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, আর্কটিক অঞ্চলের প্রাণীরা বরফের জন্য সাদা হয়, কিন্তু বরফ গলে যাওয়ায় সহজেই দৃশ্যমান হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে।
এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ বন, নোনা জলের জলাভূমি এবং ছোট দ্বীপগুলি ডুবে যাচ্ছে। এই অঞ্চলগুলিতে বসবাসকারী বিচিত্র উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। একটি ঘন সবুজ উপকূলীয় বন যখন লোনা জলে ডুবে যায়, তখন ল্যান্ডস্কেপ থেকে সেই সবুজের বৈচিত্র্য চিরতরে মুছে যায়। এভাবে সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের রঙের কাঠামো ভেঙে পড়ছে। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং বেদনাদায়ক প্রভাব হলো সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং ‘প্রবাল প্রাচীরের বিবর্ণতা’ বা ‘ক্লোরাল ব্লিচিং।’ প্রবাল হলো সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের আঁতুড়ঘর এবং এরা তাদের টিস্যুতে বসবাসকারী রঙিন শৈবালের উপর নির্ভর করে। সমুদ্রের তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেই প্রবালরা এই শৈবালকে বের করে দেয়, ফলে প্রবাল তাদের রং হারিয়ে সাদা হয়ে যায়। এই বিবর্ণতা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে এবং কার্যত সেই অঞ্চলকে প্রাণহীন করে তুলছে। প্রবালের রং হারানোর অর্থই হলো লক্ষ লক্ষ সামুদ্রিক জীবের আবাস ও খাদ্যের উৎস ধ্বংস হয়ে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের তুষার গলছে, মরুভূমি ছড়িয়ে পড়ছে, কৃষিক্ষেত্র শুকিয়ে যাচ্ছে। এইসব পরিবর্তনে প্রকৃতির রঙ একরৈখিক হয়ে পড়ছে। যেখানে একসময় শস্যের সবুজে চোখ জুড়াত, এখন সেখানে ধূসর ধুলো ও শুষ্ক মাটির রাজত্ব। এই একরঙা দৃশ্য প্রকৃতির নান্দনিক ভারসাম্যকেই নষ্ট করছে।
প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের জীবনেও রঙের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। একরকম পোশাক, একরকম ঘরবাড়ি, একরকম নগর পরিকল্পনা— সব মিলিয়ে যেন মানুষের জীবনও রঙহীন হয়ে যাচ্ছে। শহরের মানুষ কংক্রিটের বনে বন্দি হয়ে পড়েছে; ফুলের গন্ধ, গাছের ছায়া, পাখির রঙ থেকে তারা দূরে সরে গেছে। শিশুর আঁকাবাঁকা ছবিতেও এখন কেবল মোবাইল আর ধূসর বিল্ডিং, প্রকৃতির রঙ যেন হারিয়ে যাচ্ছে তাদের কল্পনাতেও। অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ব্যবহার এক নীরব ঘাতক। এখন উৎসব অনুষ্ঠানে প্রচুর কৃত্রিম আলো ব্যবহৃত হয়, গাছে গাছে এই আলো দেওয়া হচ্ছে।
এর প্রভাবে রাতের আকাশে তারাদের রং দেখতে না পাওয়া মানুষের এক অপূরণীয় ক্ষতি। এটি রাতের পোকামাকড়, যেমন রঙিন মথ, জোনাকি এবং নিশাচর পাখিদের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করছে। তারা আলোর কারণে আকৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে, যা তাদের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। কিছু গাছপালা আলোর কারণে ফুল ফোটার সময় পরিবর্তন করছে। অর্থাৎ, মনুষ্যসৃষ্ট আলো প্রকৃতির স্বাভাবিক রঙের বিন্যাসকে অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে। রঙ মানে প্রাণ, বৈচিত্র্য, আর অস্তিত্বের জ্যোতি।
পৃথিবীর বুক থেকে রঙের এই বৈচিত্র্য হারিয়ে যাওয়ার অর্থ কেবল সৌন্দর্যের হ্রাস নয়, এটি একটি পরিবেশগত বিপর্যয়। কারণ প্রতিটি রঙই কোনও না কোনও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে, তার রঙগুলোকে রক্ষা করতে হবে। বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সব ধরনের দূষণ (জল, বায়ু, আলো, শব্দ) কমানোর মাধ্যমেই এই ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই বর্ণময় গ্রহ শীঘ্রই একটি ধূসর,বর্ণহীন ও বিষন্ন গ্রহে পরিণত হবে। এই পৃথিবীকে তার পুরোনো রঙ ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। তবে আশা পুরোপুরি হারানো উচিত নয়। এখনও কিছু মানুষ ও সংস্থা পৃথিবীর রঙ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, গাছ লাগানোর অভিযান, নদী পরিশুদ্ধ করার উদ্যোগ, বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও প্রাণী সংরক্ষণের প্রকল্প ইত্যাদি তারই অঙ্গ। যদি মানবসভ্যতা প্রকৃতির এই সংকেত বুঝতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে হয়তো আবার ফুটবে রঙিন ফুল, উড়বে প্রজাপতি, গাছে জ্বলবে জোনাকি, ফিরবে আকাশের নীল ও বনভূমির সবুজ।




